চাকরিচ্যুত মেজর জিয়ার নেতৃত্বে অভিজিেক হত্যা

চাকরিচ্যূত মেজর জিয়ার নেতৃত্বেই উগ্রবাদীদের একটি দল ব্লগার ও লেখক অভিজিত্ রায়কে হত্যা করে। এজন্য রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে বাসা ভাড়া করে আস্তানা গেড়েছিল আনসার আল ইসলামের সদস্যরা। পরে তথ্য সংগ্রহ ও অভিযান পরিচালনার জন্য দুটি দলে ভাগ হয়ে হত্যা মিশন সম্পন্ন করে। ঘটনার প্রায় চার বছর পর এ মামলার চার্জশিটে উঠে এসেছে এমন তথ্য। গতকাল বুধবার ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে কাউন্টার টেররিজম বিভাগের পরিদর্শক মুহম্মদ মনিরুল ইসলাম এই অভিযোগপত্র জমা দেন। মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ঠিক করা হয়েছে ২৫ মার্চ।অভিযোগপত্রে বলা হয়, অভিজিত্ হত্যাকাণ্ডে ১২ জন জড়িত থাকলেও পাঁচ জঙ্গির পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা পাওয়া যায়নি। এক জঙ্গি ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছেন। অভিযুক্ত সব আসামি নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের সদস্য। অভিযোগপত্রভুক্ত অপর পাঁচ আসামি হলেন আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে শাহাব (৩৪), মোজাম্মেল হুসাইন ওরফে সায়মন ওরফে শাহরিয়ার (২৫), আরাফাত রহমান ওরফে সিয়াম (২৪), শফিউর রহমান ফারাবী (২৯) ও আকরাম হোসেন ওরফে আবির ওরফে আদনান (৩০)। তাদের মধ্যে জিয়া ও আকরাম পলাতক আছেন।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অভিজিত্ দেশে ফেরার পর ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে উগ্রবাদীরা তাকে অনুসরণ করতে থাকে। ২২ ফেব্রুয়ারি জাগৃতি প্রকাশনীর সামনে অভিজিেক তারা দেখে। সেখান থেকে ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের একটি রেস্টুরেন্টে খেতে যান অভিজিত্। উগ্রবাদীরা ওই পর্যন্ত তাকে ফলো করে কিন্তু সেদিন তারা কিলিং মিশন সফল করতে পারে না। পরে ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্তও তারা অভিজিেক অনুসরণ করে। শেষ পর্যন্ত ২৬ ফেব্রুয়ারি তারা হত্যাকান্ডটি ঘটাতে সক্ষম হয়।

অভিজিত্ ও তাঁর স্ত্রী ইন্দিরা রোডের যে বাসায় উঠেছিলেন, আকরাম তার আশপাশ ঘুরে আসার পর মেজর জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন। জিয়ার নির্দেশ ছিল, অভিজিেক বইমেলায় ফেলে হত্যা করতে হবে। সেই নির্দেশ অনুযায়ী ২৬ ফেব্রুয়ারি সোহেল, আকরাম, মোজাম্মেল ও হাসান বইমেলায় যান। আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই চার জঙ্গি বইমেলা থেকে বের হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মোড়ে অবস্থান নেন। তখন সায়মন আনসারুল্লার অপারেশন শাখার নেতা মুকুল রানাকে খবর দেন। রাত সাড়ে ৮টার দিকে অভিজিত্ তাঁর স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে টিএসসির উত্তর-পূর্ব পাশে যান। তখন আনসারুল্লার অপারেশন শাখার চারজন অভিজিেক কুপিয়ে হত্যা করেন। বাধা দেওয়ায় স্ত্রীকে আঘাত করা হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন জঙ্গি নেতা মেজর জিয়া, সেলিম, আকরাম, হাসান ও মোজাম্মেল। মূলত তাঁরা সেখানে প্রহরী হিসেবে অবস্থান করেন, যাতে অভিজিেক হত্যা করে নিরাপদে পালিয়ে যেতে পারেন সবাই। অভিজিেক খুন করার জন্য চাপাতি কেনার টাকা দেন মুকুল। টঙ্গী থেকে চারটি ব্যাগ ও চারটি চাপাতি কেনেন জঙ্গিরা।

কারা খুনে অংশ নেয় সে ব্যাপারে অভিযোগপত্রে বলা হয়, সেদিন আলী ওরফে খলিল ও আনিক অভিজিেক প্রথমে কোপায়। তখন হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন আরাফাত ও অন্তু। এই চারজন আনসারুল্লার অপারেশন শাখার সদস্য। অভিজিেক কোপানোর সময় একজন রিকশাচালক এগিয়ে আসলে আনিক চাপাতি উঁচিয়ে ভয় দেখান। পরে তাঁরা পালিয়ে যান। মেজর জিয়া ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে নির্দেশনা দিয়ে অভিজিেক হত্যা করেন। অভিজিেক হত্যায় প্ররোচনা দেন শফিউর রহমান ফারাবী। অভিজিত্ হত্যাকাণ্ডে ১২ জঙ্গির জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায় বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়। এর মধ্যে মুকুল বন্ধুকযুদ্ধে মারা গেছেন। হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকলেও জঙ্গি সেলিম, হাসান, আলী ওরফে খলিল, আনিক, অন্তুর পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা খুঁজে বের করতে পারেনি বলে আদালতকে জানিয়েছে পুলিশ। আনসার আল ইসলামের সামরিক শাখার প্রধান হলেন সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যূত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক।

২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় বাংলা একাডেমির একুশে গ্রন্থমেলা থেকে বাসায় ফেরার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির পাশের ফুটপাতে কুপিয়ে হত্যা করা হয় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক ড. অভিজিত্ রায়কে। এসময় তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাও আহত হন। ওই ঘটনায় অভিজিতের বাবা অধ্যাপক অজয় রায় বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।