মা ও শিশুর সুস্থতার জন্য পুষ্টি

মানুষের জীবনের অনেকগুলো স্তর যেমন: শিশু, কৈশোর, যৌবন, বৃদ্ধকাল ইত্যাদি। এর মধ্যে শিশুকালের গুরুত্ব অপরিসীম। শৈশবে অপুষ্টিতে বড় হওয়া একটি শিশুকে সারা জীবন এর কুফল বয়ে বেড়াতে হয়। পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রের জন্য তারা বোঝা হয়ে দাড়ায়। অপুষ্টি বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান জনস্বাস্থ্য সমস্যা। একজন অপুষ্টিতে ভোগা মা জন্ম দেন আরেকটি অপুষ্ট শিশু। এভাবেই অপুষ্টির দুষ্টচক্র আমাদের সমাজ জীবনে বৃত্তের মত ঘুরপাক খাচ্ছে।
 
মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর অন্যতম প্রধান হলো খাদ্য। বর্তমান বিশ্বে আমাদের মত দরিদ্র দেশের প্রধান সমস্যা হলো খাদ্য সংকট। বিপুল জনগোষ্ঠীর এই খাদ্য ঘাটতির কারণে পুষ্টির অভাবে শিশুদের একটি বিরাট অংশ মারাত্মক স্বাস্থ্য সংকটে ভুগছে। মায়ের স্বাস্থ্যের সাথে শিশুর স্বাস্থ্যের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কারণ জন্মের পর থেকে ৫ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর একমাত্র খাবারই হলো মাতৃদুগ্ধ। মায়ের বুকের দুধ শিশুর সর্বশ্রেষ্ঠ খাবার। শিশু পুষ্টির সমস্ত উপাদান মাতৃদুগ্ধে রয়েছে। মায়ের বুকের দুধ শিশুর বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধের সকল প্রকার উপাদান রয়েছে। শাল দুধে রোগ প্রতিষেধক ক্ষমতা আছে বলে একে শিশুর জীবনের প্রথম টিকা বলা হয়।
 
অপুষ্টির সাথে শিশুমৃত্যুর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ইউনিসেফের এক জরিপে দেখা যায়, অপুষ্টিজনিত শিশু মৃত্যুর হার দরিদ্র দেশগুলোতেই বেশি। বিশেষ করে এশিয়া এবং আফ্রিকার মতো দরিদ্র দেশগুলোতে শিশুরা ওজন স্বল্পতা ও অপুষ্টিতে ভুগছে। আমাদের দেশে শতকরা ৬০ ভাগ শিশু কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। দারিদ্র্যের কারণে দেশের গ্রামাঞ্চলে এক-চতুর্থাংশ এবং শহরের বস্তি এলাকায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে প্রতিদিন জনপ্রতি ১ হাজার ৫শত কিলো ক্যালরির কম খাদ্য গ্রহণ করতে হয়। খাদ্য ঘাটতির কারণে কম বয়সী শিশুদের শতকরা ৪৭ ভাগ শিশুই মারাত্মক স্বাস্থ্যহীনতায় ভোগে। এর মধ্যে রক্তস্বল্পতা একটি অন্যতম কারণ।
 
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অনুর্ধ্ব চার বছর বয়সী শতকরা ৫১ ভাগ শিশু রক্ত স্বল্পতায় ভুগছে। শিশুর পুষ্টির ওপর নির্ভর করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, বুদ্ধি, বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ জীবন। ফলে একজন সুস্থ শিশু জন্মদানের জন্য গর্ভবতী মাকে প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার ও বিশ্রাম গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা প্রয়োজন। অজ্ঞতা ও অসচেতনতার কারণেও শিশু ও নারীরা অপুষ্টির শিকারে পরিণত হয়। এছাড়া অশিক্ষিত, গ্রাম্য কুসংস্কার, গর্ভবতী মায়ের খাদ্য গ্রহণের ওপর বাধা-নিষেধ তো রয়েছেই। একজন গর্ভবতী মায়ের যখন বাড়তি পুষ্টির প্রয়োজন, তখন তাকে তা থেকে বঞ্চিত করা হয়। ফলে গর্ভবতী মা অপুষ্টির শিকার হয়ে প্রসবকালীন জটিলতায় আক্রান্ত হয়।
 
গর্ভকালীন অনাগত শিশুর যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। অজ্ঞতার কারণে কখনও কখনও গর্ভবতী মহিলাদের যত্ন নেয়া হয় না। ফলে গর্ভের সন্তান জন্মগ্রহণ করে জন্মগত ত্রুটি নিয়ে। যার মধ্যে রয়েছে অন্ধত্ব, রাতকানা, হাবাগোবা হওয়া, শারীরিক বিকলাঙ্গতা, বামনত্ব ও অন্যান্য জন্মগত রোগসমূহ। যার ফলে নানাবিধ সমস্যার মধ্যে তাদের অভিশপ্ত জীবনযাপন করতে হয়। তাই গর্ভবতী মায়ের খাদ্য ও পুষ্টির দিকে আগে যত্নবান হতে হবে।