বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে

যতীন সরকার

বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে আমার প্রথম কথা হলো: নতুন প্রজন্মের সামনে বঙ্গবন্ধুর জীবনী সঠিকভাবে তুলে ধরতে হবে। শেখ মুজিবুর রহমান কীভাবে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠলেন—সেই বিষয়টি অন্তত স্বচ্ছতার সঙ্গে লিখতে হবে। শেখ মুজিবুর রহমান তো প্রথম জীবনে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই যুক্ততা অন্য অনেকের চেয়ে পৃথক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিল। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে পাকিস্তান আন্দোলনে তিনি যোগদান করেননি, তিনি চেয়েছিলেন সমাজের কোনো গোষ্ঠী যাতে কোনো মতেই বিকাশের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে না পড়ে সেজন্যই একটু বিশেষ সমতা প্রতিষ্ঠাকারী রাষ্ট্রের দরকার। সেই রাষ্ট্রই হতে পারে পাকিস্তান। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই তিন উপলব্ধি করতে পারলেন যে, নব প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটিতে তো তাঁর আকাঙ্ক্ষা কোনো মতেই বাস্তবায়িত হতে পারে না, পাকিস্তানের জিন্না সাহেব যেদিন উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে বলে ঘোষণা করলেন সেইদিন থেকেই অন্য অনেকের মতো পাকিস্তান সম্পর্কে শেখ মুজিবের মোহভঙ্গ ঘটেছিল। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা না হলে এ অঞ্চলের জনগণের প্রকৃত মুক্তি কোনো মতেই ঘটে উঠবে না। তার ধারণা বিশেষ করে পরিপুষ্ট হয়ে ওঠে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন জারির পর। ১৯৬১ সালের শেষ দিকেই তিনি ইত্তেফাক সম্পাদক মানিক মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে আত্মগোপনে থাকা কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মনি সিং-এর সঙ্গে এক বৈঠকে মিলিত হন। সেই বৈঠকে শেখ মুজিব স্পষ্ট অভিমত ব্যক্ত করেন যে, পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানের অধীন থেকে মুক্ত করার জন্যই অবিলম্বে আন্দোলন সৃষ্টি করতে হবে। কমিউনিস্ট পার্টি পূর্ববাংলার স্বাধীনতার পক্ষে থাকলেও সেই মুহূর্তে এইরূপ আন্দোলন করা সঠিক হবে না বলে অভিমত প্রদান করে।

স্বাধীনতার আন্দোলনের পরিবর্তে তখনকার মতো এই এলাকার তথা সমগ্র পাকিস্তানের জন্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করাই সেসময়কার বিশেষ সময়ে উপযোগী হবে বলেই কমিউনিস্ট পার্টি মত দেয়। শেখ মুজিব সেই অভিমত সেই সময়ের জন্য মেনে নিলেও এ স্বাধীনতার যে কোনো বিকল্প নেই সে বিষয়ে তিনি দৃঢ় থাকেন। কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে মোটামুটি সমঝোতা করেই শেখ মুজিব সেই সময়কার জন্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকেই বেছে নেন, কিন্তু উপযুক্ত সময় এলেই যে স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে হবে সে কথা জানিয়ে দেন। কমিউনিস্ট পার্টি ও শেখ মুজিবের সঙ্গে ঐকমত্যে আসে। এরপর ১৯৬৬-এর ৬ দফা থেকে শুরু করে ৭৯-এর ১১ দফা পর্যন্ত সমস্ত আন্দোলনকে কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থন দিয়ে যায়। ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমেই শেখ মুজিব যথার্থ বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেন। এবং স্বাধীনতার পর তাঁর রাষ্ট্রীয় মূলনীতিভিত্তিক সংবিধান প্রণয়ন করে স্বাধীন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা শুরু করেন।

তার পরের ইতিহাস তো একান্তই মর্মান্তিক। স্বাধীনতা বিরোধীদের হাতে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু নিহত হলেন। রাষ্ট্রের মূলনীতি পাল্টে গেল, পাকিস্তানের ভূত এসে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ঘাড়ে চেপে বসল। সেই ভূত ছাড়ানোর মন্ত্রই বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে আমাদের গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশের তার রাষ্ট্রীয় মূল নীতির যথাযথ প্রতিষ্ঠা আনতে হবে। ধর্মান্ধ ও মৌলবাদী শক্তিকে সম্পূর্ণরূপে পরাজিত করেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের যথার্থ প্রতিষ্ঠাও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠা ঘটাতে হবে। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে এই প্রত্যয় ও প্রতিজ্ঞা নিয়ে আমাদের সকলকে অগ্রসর হতে হবে।

লেখক: বুদ্ধিজীবী