উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরের ৭ নম্বর রোডের ৪০/এ নম্বর বাড়ি। ছয় তলা এই ভবন থেকে কলেজ ছাত্র নাসির উল্লাহ (১৭) গত ২৪ ফেব্রুয়ারি সকালে লিফটে নামছিল। দ্বিতীয় তলায় হঠাত্ লিফটটি আটকে যায়। অনেক চেষ্টা করেও লিফটটি সচল করা যায়নি। পরে কল করা হয় ৯৯৯ নম্বরে। ৯৯৯ থেকে বিষয়টি জানানো হয় উত্তরা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনকে। সিনিয়র স্টেশন কর্মকর্তা সফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি টিম ছুটে যায় ঘটনাস্থলে। অত্যাধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করে ১০ মিনিটের মধ্যে নাসির উল্লাহকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়ার পর নাসির উল্লাহ জানায়, লিফট আটকে যাওয়ার পর তার ফ্যানও বন্ধ হয়ে যায়। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। উদ্ধার হতে পারব কী না তাও জানতাম না।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে চলন্ত লিফট হঠাত্ আটকে যায়। অনেক সময় ঘটে দুর্ঘটনাও। হচ্ছে প্রাণহানিও। বেসরকারি ভবনের পাশপাশি সরকারি ভবনেগুলোতেও লক্কর-ঝক্কর লিফট আটকে যায় প্রায়ই। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি লিফট পরিচালনার জন্য একজন লিফট অপারেটর থাকার কথা থাকলেও তা নেই অধিকাংশ ভবনে। গত ৭ মার্চ ঢাকা মহানগর দায়রা ও জেলা জজ আদালতের ছয়তলা ভবনের পাঁচতলা থেকে লিফট ছিঁড়ে নিচে পড়ে ১০ জন আহত হন। জজ আদালত ভবনের এই লিফটটি অন্তত ৪০ বছরের পুরান ছিল। কর্তৃপক্ষ লিফটটি সরিয়ে ফেলার জন্য গণপূর্ত বিভাগে চিঠিও দেয়। এরপরও সরানো হয়নি। দুর্ঘটনার পর টনক নড়ে।
গত বছরের ১৩ অক্টোবর শুভ্রা কর নামের এক নারী তার ফেসবুকে একটি পোস্টে বলেন, ‘সায়েন্স ল্যাব মোড়ে আড়ংয়ের মার্কেটের লিফটে আধ ঘণ্টা ধরে ৫ জন আটকা পড়ে আছি। অনেক জায়গায় ফোন করেও কাজ হচ্ছে না। জেনারেটর নেই। কেউ হেল্প করতে পারেন প্লিজ?’ প্রথম পোস্টটি দেওয়ার ৩১ মিনিট পরে তিনি আবারও ফেসবুকে একটি পোস্টে লিখেছেন, ‘প্রায় ৪৫ মিনিট লিফটে আটকা থাকার পর আমরা বের হতে পারছি।’ এই ঘটনা নিয়ে ওই রাতেই শুভ্রা কিছু ছবিসহ বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে আবারও একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। ওই পোস্টটি দেওয়ার পরই তা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। ২০১৬ সালের ২৪ জুন উত্তরার একটি শপিং মলের লিফট ছিঁড়ে পড়ে নিহত হন পাঁচজন। হাসপাতালে মারা যায় আরও দুজন। সেই আলোচিত ঘটনার পর দেশজুড়ে লিফট ব্যবহারকারীদের মধ্যে ব্যাপক ভয়ের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু তারপরও অবহেলার কারণে থেমে নেই এই দুর্ঘটনা।
মায়ের জন্মদিনে লিফটের চাপায় মৃত্যু: ঘটনাটি ছিল গত বছরের ২৯ মার্চে। স্ত্রী উম্মে সালমার জন্মদিন ছিল। তাই সে রাতে স্বামী শিপলুর রহমান তাদের ৯ বছরের ছোট মেয়ে আলভিরাকে নিয়ে বাইরে বেরোচ্ছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল ছোট করে জন্মদিনটি উদযাপন। ১৫তলার বাসা থেকে নিচে নামার জন্য লিফটে ওঠেন। কিন্তু লিফটের সেন্সর ঠিকমতো কাজ না করায় দরজার মাঝে চাপা পড়ে ছোট্ট আলভিরার মৃত্যু হয়। রাজধানীর শান্তিনগর মোড়ে ‘গ্রিন পিস’ নামের ১৮তলা ভবনে এ ঘটনাটি ঘটে। ওই ভবন পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. আলমগীর মিয়া বলেছিলেন, ‘আগে থেকেই লিফটির সমস্যা ছিল। তবে কেন এ ভাবে হঠাত্ সেন্সর বন্ধ হয়েছে, সে বিষয়ে লিফট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে কারণ জানাতে নোটিশ পাঠানো হবে।’
হাসপাতালের লিফটেই মৃত্যু হয় রোগীর: ২০১৪ সালে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালে দেড় ঘণ্টা লিফটে আটকে হার্ট অ্যাটাকে সুলতানা বেগম (৩৫) নামে এক রোগীর মৃত্যু হয়েছিল। তার পরিবারের অভিযোগ, যদি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ উদ্ধারের ব্যবস্থা করত, তাহলে সুলতানার মৃত্যু হতো না।
যেভাবে চলে লিফট: লিফটের ভেতর একটি সেন্সর থাকে। এই সেন্সরই লিফটের চালিকাশক্তি। তবে সেন্সর অনুযায়ী এর কাজ করার ব্যাপারটা যথেষ্ট জটিল। লিফটে প্রবেশ করার পরপরই দেখা যায়, দরজা বন্ধ হয়ে গেল। এর কারণ হলো, লিফটের দরজাতেও একটি ছোট সেন্সর বসানো থাকে, যেটি বুঝতে পারে দরজার মাঝে কেউ দাঁড়িয়ে আছে কী না।
লিফটে আটকে গেলে করণীয়: উত্তরা ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন কর্মকর্তা সফিকুল ইসলাম বলেন, লিফটের ভেতরে আটকে গেলে আতঙ্কিত না হয়ে ঠান্ডা মাথায় কাজ করতে হবে। প্রত্যেক লিফটে একটি কল বাটন আছে, যেটা রিসিপশন বা সিকিউরিটি রুমের সঙ্গে সংযুক্ত করা থাকে। যদি অভ্যন্তরীণ সিস্টেমে কোনো সমস্যা না থাকে, তাহলে আপনি খুব দ্রুত সাহায্য পাবেন। ব্যর্থ হলে লিফটের দরজায় শব্দ করে নিকটবর্তী মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করতে পারেন। এতেও কাজ না হলে ৯৯৯ এ ফোন করে সহায়তা নিতে পারেন। ফায়ার সার্ভিসের কাছে অত্যাধুনিক যন্ত্র রয়েছে যা দিয়ে লিফট খুলে দুর্গত ব্যক্তিকে উদ্ধার করা সম্ভব। এই বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের ঢাকার উপ-পরিচালক দেবাশীষ বর্ধন বলেন, লিফটে আটকে পড়া ব্যক্তিকে উদ্ধার করতে প্রতিটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে ‘মাস্টার কি’ (চাবি) রাখা আছে। মাস্টার কি কাজ না করলে অত্যাধুনিক স্পেডার মেশিন ব্যবহার করা হয়। তবে লিফটকে দুর্ঘটনা মুক্ত করতে ভবন মালিক, ফ্ল্যাট মালিক, লিফট স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠান ও ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত সার্ভিসিং সিস্টেম থাকতে হবে। এটা করতে পারলে লিফট দুর্ঘটনার সংখ্যা কমে আসতে পারে।