লাঙ্গলবন্দে দশ পূন্যার্থীর পদদলিত হয়ে মৃত্যুকে স্মরণ

 
বাংলাদেশে হিন্দুর্ধমাবলম্বীদের কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পায়ের নিচে পৃষ্ঠ হয়ে ৭জন মহিলাসহ ১০জন পূন্যার্থীর মৃত্যু এবং শতাধিক পূন্যার্থীর আহত হওয়ার ঘটনা সম্ভবত নারায়ণগঞ্জের বন্দরে লাঙ্গলবন্দে ব্রহ্মপুত্র নদে অষ্টমী স্নানোৎসবেই ঘটেছিল।
 
২০১৫ সালের ১৩ মার্চ প্রচণ্ড ভিড়ে পদদলিত হয়ে ১০ জনের মৃত্যু হয় আহত হয় শতাধিক। ব্রহ্মপুত্র নদের ১৬টি ঘাটের মধ্যে রাজঘাটে স্নান করলে বেশি পুণ্য অর্জন হবে বলে বরাবরই ভিড় হয়। কিন্তু গত বছরের সেইদিনের ঘটনায় আজো গা শিউরে উঠে সবার। ভোরে লাঙল বন্দের অনুষ্ঠানস্থলে হঠাৎ নারী পুরুষের র্আত চিৎকার আর পূন্যার্থীদের কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায়। জানা যায় ঘাটে লোকজনের ভীর বেশি থাকায় এক সময়ে হঠাৎ করে একটি ব্রিজ ভেঙ্গে যাওয়ার গুজবে লোকজনের হুড়োহুড়িতে অনেকে নিচে পড়ে গেলে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে।
 
লাখো বছরের প্রাচীন লাঙ্গলবন্দের স্নানের ইতিহাসে পদদলিত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা এটিই প্রথম বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদউদ্দিন ও লাঙ্গলবন্দ স্নান উদযাপন পরিষদের তৎকালীন সেক্রেটারি বাসুদেব চক্রবর্তী ১০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। পরে নিহত প্রত্যেক পরিবারকে লাশ সৎকারের জন্য স্থানীয় এমপি সেলিম ওসমানের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়। এ ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।যার প্রকৃত তথ্য এখনও সাধারণ মানুষ জানে না।
 
সেদিনের ছিল ১৩ মার্চ  শুক্রবার ভোর ৫টা ৪৮ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড থেকে তিথি শুরু হওয়ার পরেই ব্রহ্মপুত্র নদে ১৬টি ঘাটে স্নানে নামে হাজার হাজার হিন্দু পুর্ণ্যাথী। স্নানোৎসব শেষ হওয়ার কথা ছিল শনিবার ভোর ৬টা ৫৯ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডে।  পুণ্য স্নানের জন্য লাঙ্গলবন্দে যে ১৬টি ঘাট ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে রাজঘাটকে প্রধান বা বড় ঘাট হিসেবে ধরা হয়। আগতদের বিশ্বাস ১৬টি ঘাটের মধ্যে রাজঘাটে স্নান করতে পারলে পাপ মোচন নিশ্চিত হয়ে থাকে। তাই এ ঘাটে পূন্যার্থীদের ভিড়ও থাকে বেশি। সকাল ৯টার দিকে রাজঘাট সংলগ্ন একটি বেইলী ব্রিজে হঠাৎ করে এক নারী অসুস্থ হয়ে পড়লে ব্রিজের এক পাশে বসে যায়। ওই সময়ে পেছন থেকে মানুষের ধাক্কায় সঙ্গে আসা কয়েকজন ধাক্কা খেয়ে ব্রিজের মধ্যে পড়ে গেলে ব্রিজ ভেঙে গেছে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে লোকজন হুড়োহুড়ি করে ছুটতে থাকে। ওই সময়ে পদদলিত হয়ে আহত হয় একের পর এক লোকজন। তাদের মধ্যে ১০জন ঘটনাস্থলেই মারা যায়। 
যারা সেদিন পদদলিত হয়ে নিহত হন তারা হলেন, মানিকগঞ্জের জাদরা এলাকার বলাই চন্দ্র দাসের স্ত্রী মালতি দাস (৬০) ও তার ছেলে নিতাই (নিত্য) গোপল দাস (৩০), গোপালগঞ্জ জেলার গোসালকান্দি গ্রামের নকুল চন্দ্র বিশ্বাস (৫৫), কুমিল্লা জেলার চান্দিনা থানার রামচন্দ্রপুর গ্রামের কালিপদ নন্দির ছেলে রঞ্জিত চন্দ্র নন্দি (৫৫), কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দির নারায়ণ সাহার স্ত্রী কানন সাহা (৫০), কুমিল্লা জেলার মুরাদনগরের পরিমল সাহার স্ত্রী তুলশি দেবনাথ (৫২), ঢাকার ধানমন্ডি এলাকার নিতাই চন্দ্র দাসের স্ত্রী ভগবতি দাস (৫০) ও তার পুত্রবধূ রাখী দাস (২৮), নোয়াখালী জেলার কবিরহাটের অনিল চন্দ্র নাগের স্ত্রী ভানুমতি নাগ (৫০) ও পটুয়াখালী জেলার বাউফল থানার মৃত বিজেন্দ্র লাল সাহার স্ত্রী সুচিত্রা রানী সাহা (৭০), নিহতদের মধ্যে নকুল চন্দ্র বিশ্বাস মাদারীপুরের চরমুগরিয়া কলেজের অধ্যাপক।
 
সেদিন ঘটনার জন্য সেলিম ওসমান রাস্তার দুইপাশে অবৈধ দখলদারদের দায়ী করে বলেন, এমন ঘটনা যেন ভবিষ্যতে না ঘটে এর জন্য রাস্তার দুই পাশে যারা অবৈধ দখলদার রয়েছে। তাদেরকে উঠিয়ে দিয়ে রাস্তাটা আরো প্রশস্ত করা হবে।
 
উল্লেখ্য, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অষ্টমী স্নান একটি বড় উৎসব। উৎসবটি পড়েছে শুক্রবার এবং মানুষ লম্বা ছুটি পেয়েছে। তাই অন্যবারের থেকে ২০১৫ সালে তিনগুণ মানুষ বেশি হয়েছে। তাছাড়াও গরম ছিল অনেক বেশি। সবাই গরম বাড়ার আগেই স্নান শেষ করে চলে যেতে চেয়ে ছিল। তাই লোক জনের ভিড়টা বেশি হয়ে গেছে। এরমধ্যে একটি গুজবকে কেন্দ্র করে ধাক্কা ধাক্কি ফলে এমন ঘটনাটি ঘটেছে। তবে কে বা কারা এই গুজবের হোতা তা খুঁজে বেড় করা জরুরি বলে মনে করে সকলে। নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার লাঙল বন্দে ব্রক্ষ্মপুত্র নদে অষ্টমী স্নানে পদদলিত হয়ে ১০ জনের মৃত্যুর ঘটনা আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে ছড়িয়ে পরে। বিবিসি নিউজেও প্রচার করা হয় মর্মান্তিক এ ১০ জন মৃত্যুর ঘটনা। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের মতই বিশ্বের অন্য দেশের টিভি চ্যানেলগুলো ও গণমাধ্যমে এ খবর গুরুত্ব দিয়ে প্রচারিত হয়।
 
ভারতের জনপ্রিয় টাইমস অব ইন্ডিয়া, রেডিফ ইন্ডিয়া অ্যাবরোড, ইন্ডিয়া টুডে, দ্যা হিন্দু, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, আমেরিকার ভয়েস অব আমেরিকা, রবিনসপোস্ট ডটকম, ডেইলি গ্লোবাল নিউজ, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি মর্নিং হ্যারাল্ড, গ্লোববল, জীবলজী, বিনিউজ ওয়ার্ল্ড, আফগানিস্তানের ব্রেকিং নিউজ ক্ষমা প্রেস, কানাডার গ্লোব এন্ড মেইল, ডেইলি টাইমস পাকিস্তান, আইবি টাইমস ইউকে নামে এসব মিডিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়াগুলোতে ব্রেকিং নিউজ ছিল বন্দরের পুন্য স্নানে ১০ জন নিহতের ঘটনা। লাঙল বন্দের অষ্টমী স্নানে পদপিষ্ট হয়ে ১০জনের মৃত্যু নারায়ণগঞ্জের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ইতিহাসে কালো অধ্যায় হিসেবে যোগ হয়।