কাঁটাতারে ভালবাসা আর্তনাদ

বিজিবি ও বিএসএফের বাঁধা, ধর্ম-বর্ণ-গোত্র, ভৌগোলিক সীমারেখার বেড়াজাল, কাঁটাতারের বেড়া কোনটাই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারেনি। দীর্ঘ ৪ ঘণ্টা অপেক্ষার পর দুপুর ১টা ১০ মিনিটে মায়া-মমতা আর ভ্রাতৃত্বের নিবিড় বন্ধনে মিশে একাকার হয়ে যান বাংলাদেশ ও ভারতের নাগরিকদের মিলন মেলা।
 
বুধবার দুপুর ১টা ১০ মিনিটে ভারতের খালপাড়া ও বাংলাদেশের জেলার সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নের অমরখানা ও বোদা পাড়া সীমান্তের মেইন পিলার ৭৪৩, ৭৪৪ ও ৭৪৫ নম্বর আর্ন্তজাতিক সীমানা পিলারের ৩-৪ কিলোমিটার এলাকায় দুই বাংলার হাজার হাজার মানুষের মিলন মেলায় পরিনত হয়।
IMG0
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের কারণে মোবাইলে যোগাযোগ করে দুই দেশের নাগরিকরা পহেলা বৈশাখের একদিন আগেই এই মেলায় মিলিত হয়েছেন। সকাল থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয় অমরখানা সীমান্তের নো-ম্যান্স ল্যান্ডে।
 
কিন্তু সকাল থেকে দুই দেশের নাগরিকদের মিলনে বিজিবি ও বিএসএফ বাঁধা দিয়ে আসছিল। কিন্তু দুপুর ১টা ১০ মিনিটে দুই দেশের নাগকিদের ভালোবাসার কাছে কোনকিছুই বাধা হয়ে দাড়াতে পারেনি।
 
৪৭ সালে দেশবিভক্তির সঙ্গে ভাগ হয়ে যায় উভয় দেশের হাজার হাজার পরিবার। দুটি দেশে বসবাস করলেও দীর্ঘদিন পর বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, চাচা-চাচি, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজনদের সান্নিধ্য আর মনের মাঝে দীর্ঘদিনের জমে থাকা অব্যক্ত ভাবভাষা বিনিময়ের জন্যই এই মিলন মেলা।
 
কাটাতারের দুই পাড়ে উভয় দেশের হাজার হাজার নারী-পুরুষ অবাল বৃদ্ধ বনিতা ভিড় করে অমরখানা সীমান্তে। মিলনের প্রবল ইচ্ছায় সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত খেয়ে না খেয়ে এসব মানুষ ভিড় জমান এই সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার পাশে। একে অন্যকে জড়িয়ে ধরা, আনন্দে কান্নায় ভেঙে পড়া, দেখা-সাক্ষাৎ, কথোপকথন আর খোশগল্পে মেতে উঠে হাজারো মানুষ। স্বজন ও পরিচিতদের দেখে অনেকে আবেগে কেঁদে ফেলেন।
IMG1
১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্তির পর অনেক আত্মীয়-স্বজন ভারত-বাংলাদেশের অংশে পড়ে। ফলে অনেকেরই যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়। পাসপোর্ট করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ভারত গিয়ে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা ব্যয় এবং সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তাই দুই বাংলার আত্মীয়স্বজনেরা এই মিলনের দিনটির জন্যই অপেক্ষা করেন।
 
এ মিলন মেলায় পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাটসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজার হাজার মানুষ এ মিলন মেলায় এসেছেন। অপরদিকে ভারতের জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, কোচবিহারসহ বিভিন্ন জেলার মানুষ তাদের আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করেছেন। এই মিলন মেলা চলবে সন্ধ্যা অবধি।
 
সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, মা-মেয়েকে, বাবা-ছেলেকে, ভাই-বোনকে দেখতে পেয়ে দুচোখ বেয়ে চোখের জল ফেলছে কিন্তু কেউ কাউকে স্পর্শ করতে পারছে না। স্পর্শ করতে না পারায় কারো কারো চোখে অশ্রু, আবার দীর্ঘদিন পর বাবা-মা, ভাই-বোনসহ আত্মীয়-সজনদের সঙ্গে দেখা করতে পেরে  কারো কারো চোখেমুখে খুশির ঝিলিক। মিলন মেলায় ভারত ও বাংলাদেশের নাগরিকদের এই মিলন মেলার হাসি-কান্নার নীরব সাক্ষী কাঁটাতার।
 
ভারতের শিলিগুড়ির বৌবাজারে থাকা শৈলেন ও সুবোধ নামে দুই ছেলেকে দেখতে আসেন ঠাকুরগাঁও জেলার গড়েয়া গুঞ্জরগড় এলাকার সুশীলা (৫৫)। গতবার আসেননি এবারে  এসেছেন দুই ছেলের সঙ্গে দেখা হয়েছে। ছেলেরা শাড়ি ফলমূল দিয়েছে। খুব ভালো লাগছে। পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার আমলাহার কালেশ্বর এলাকা থেকে এসেছেন মা দয়ামনি (৬০) ও ছেলে যাদব (৪০)। জলপাইগুড়ি শিবমন্দির এলাকায় থাকেন প্রহল্লাদ ও দীনবন্ধু নামে যাদবের দুই ভাই। মা ও ছেলেদের মিলনমেলায় দেখা হয়েছে। অনেক কথা হয়েছে। বয়স হয়েছে এটাই মনে হয় শেষ দেখা জানান প্রহল্লাদ ও দীনবন্ধুর মা দয়ামনি।
 
তেতুলিয়ার মুলুকচাঁদগজ এলাকা থেকে ক্ষিতিশ চন্দ্র রায় (৮১) শিলিগুড়ির পানির ট্যাঙ্ক ও চটেরহাট এলাকায় থাকা দুই কন্যা ক্ষিরমতি ও নিরমতির সঙ্গে দেখা করতে। দীর্ঘদিন পর বাবা ও দুই মেয়ের মিলন হল এই মিলনমেলায়।
 
ভারতের চোপড়ামারি থানার সোনপুর এলাকায় থাকেন অলোক রায়। তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন জেলার বোদা উপজেলার পাঁচপীর ইউনিয়নের হরিনিমাইপাড়া এলাকার কৃষ্ণ রায় (৪৫)। এবারই প্রথম দেখা হল ভাইয়ের। উভয় পরিবারের মধ্যে খোঁজখবর নিলেন তারা।
 
পঞ্চগড় থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মোমিনুল ইসলাম মোমিন জানান, সীমান্ত এলাকায় যাতে আইনশৃঙ্খলার অবনতি না ঘটে সেজন্য পুলিশও সীমান্তের বাইরে টহলে রয়েছে।
 
পঞ্চগড় ১৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেজর আবু নাঈম মো. সালাহ উদ্দীন জানান, প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে দুই বাংলার মানুষের মিলন মেলা অনুষ্ঠিত হয়। আমরা পহেলা বৈশাখে এটা করার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু উভয় দেশের মানুষ মোবাইলে যোগাযোগ করে নো ম্যান্স ল্যান্ডে নিজেরা এসে জড়ো হন।