রাজধানীর বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ

পরিবেশ অধিদপ্তর নির্মল বায়ু ও টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২০১৪ সালের এপ্রিল হইতে প্রতিদিন রাজধানী ঢাকার বায়ুর মান পরীক্ষা করিয়া আসিতেছে। এই অধিদপ্তরের বাতাসের মান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সামপ্রতিক এক তথ্যে দেখা যায়, গত কয়েক বত্সরে ধারাবাহিকভাবে রাজধানীতে বায়ুদূষণের সময় ও দিন বাড়িতেছে। সাধারণত নভেম্বর হইতে মার্চ পর্যন্ত রাজধানীর বাতাস দূষিত থাকে। তন্মধ্যে সবচাইতে বেশি দূষণ থাকে ডিসেম্বর হইতে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। শীতকালীন শুষ্কতার কারণে এই সময় বাতাস সহজেই দূষিত হইয়া পড়ে। কিন্তু বর্তমানে মার্চ ও এপ্রিল মাসেও বাতাসে দূষণের মাত্রা বেশি দেখা যাইতেছে। আবার পরিবেশ সংক্রান্ত আরেক গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৬ সালে ১২৯, ২০১৭ সালে ১৮৫ ও ২০১৮ সালে ১৯৭ দিন রাজধানীর বায়ু ছিল মারাত্মক অস্বাস্থ্যকর। গবেষকরা বলিতেছেন, ঢাকার বাতাসে দ্রুত দূষণকারী পদার্থ ছড়াইয়া পড়িতেছে প্রধানত অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজের কারণে। বিশেষ করিয়া মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ যেসব এলাকায় চলিতেছে, সেখানে দূষণের মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি। এই প্রেক্ষাপটে গত ১৩ মার্চ হাইকোর্ট চরম হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করিয়াছেন। আগামী ১০ এপ্রিল পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে (ডিজি) আদালতে তলব করা হইয়াছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, বিশ্বে বায়ুদূষণের কবলে থাকা রাজধানী শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। এই শহরের বাতাসে ক্ষুদ্র বস্তু কণিকার পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাঁধিয়া দেওয়া মাত্রার চাইতে ১০ গুণ বেশি। ইহাতে স্বাস্থ্যজনিত নানা সমস্যা দেখা দিতেছে। বাংলাদেশ অ্যাজমা অ্যাসোসিয়েশনের মতে, দেশে হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টজনিত রোগীর সংখ্যা প্রায় এক কোটি এবং প্রতি বত্সর নূতন করিয়া যোগ হইতেছে প্রায় আড়াই হইতে তিন লক্ষ মানুষ। ইহার প্রধান কারণ বায়ুদূষণ— যাহা ইটভাটা, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, যানবাহন হইতে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া, ভবন বা রাস্তাঘাট নির্মাণ সংক্রান্ত ধূলাবালি ইত্যাদির কারণে সৃষ্টি হয়। গবেষকরা বলিতেছেন, ঢাকার ৯০ শতাংশ বাসিন্দা এখন বায়ুদূষণের শিকার। ৪০ শতাংশ বাসিন্দা শ্বাসনালীর রোগে আক্রান্ত। ইহাছাড়া নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিস, চোখের সমস্যা, সর্দি, কাশি, যক্ষ্মা, হূদরোগ, অ্যাজমা, ফুসফুস ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগের কারণ বায়ুদূষণ। উদ্বেগের বিষয় হইল, দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই সরকারি। তাহারা দূষণরোধে নিয়মিত পানি ছিটানো, কর্মক্ষেত্রের চারিপাশ যথারীতি ঘিরিয়া রাখা ইত্যাদি দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করিতেছে না। সবগুলো অবকাঠামো নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য দূষণ নিয়ন্ত্রণে পৃথক বাজেট থাকে। কিন্তু অনেক সময় এই খাতে ব্যয় না করিয়া তাহা মুনাফায় রূপান্তর করা হয় যাহা মোটেও প্রত্যাশিত নহে। তাই দূষণকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা অত্যাবশ্যক।

রাজধানীতে বায়ুদূষণ বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, তাহা হইলে কি উন্নয়মূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করিয়া দিতে হইবে? তাহা নিশ্চয়ই নহে। তবে যেসব কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাহাদের চেষ্টা করিতে হইবে যাহাতে দূষণ কম হয় বা তাহা নিয়ন্ত্রণে থাকে। এইজন্য প্রতিদিন অন্তত দুই বেলা পানি ছিটাইবার ব্যবস্থা করিতে হইবে। তাহাছাড়া যে সময় দূষণ একটু বেশি ছড়াইবার আশঙ্কা থাকিবে, সেইসময় নাগরিকদের নানাভাবে সতর্কবার্তা প্রদান করা যায়। আবহাওয়া পূর্বাভাস দেওয়ার প্রচলন আমাদের দেশে বহুদিন ধরিয়াই বহাল আছে। ইহার পাশাপাশি বায়ুদূষণের পূর্বাভাস দিবার কথা একসময় উঠিলেও তাহা এখনও কার্যকর হয় নাই। এই ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করি।