তরুণদের নিজের শক্তির উপর বিশ্বাস রাখতে হবে

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

তরুণদের মধ্যে আমি সবসময় একটা সম্ভাবনা দেখতে পাই। তরুণদের স্বপ্নগুলো সম্ভাবনা সৃষ্টি করে আর সেখান থেকে আমরা আশাবাদী হবার মতো আগামীর পৃথিবীকে দেখতে পাই। তরুণদের উপর বিশ্বাস রাখা মানে ভবিষ্যতের উপর বিশ্বাস রাখা। এজন্য তরুণদের একটি কথাই বলবো, নিজের শক্তির উপর বিশ্বাস রাখো। তোমার শক্তিই পারে তোমাকে এগিয়ে নিতে, কখনো নিজের স্বপ্ন আর বিশ্বাসের কাছে হার মেনো না। তোমাদের জীবনে প্রতিবন্ধকতা আসতে পারে, একটার পর একটা বাধা আসতে পারে কিন্তু তাতে ভেঙে পড়লে চলবে না। বরং প্রতিবন্ধকতা কিংবা বাধা-বিপত্তিকে কিভাবে অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়া যায় তার সমাধান বের করার মতো আত্মবিশ্বাস আর চিন্তাশক্তি তোমাদের মধ্যে থাকতে হবে। সময়ের চেয়ে নিজেকে কিভাবে এগিয়ে রাখবে তার ভাবনাটাও তোমাদের মধ্যে থাকতে হবে।

তরুণরা আছে বলেই আবেগ আছে। এই আবেগ এমন একটি অদৃশ্য শক্তি যা পৃথিবী কিংবা মানুষের ইতিহাস বদলে দিতে পারে। তবে তোমাদের আবেগ তোমাদের হাতেই থাকতে হবে। এটি যাতে কারো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়, সে বিষয়ে তোমাদের সজাগ থাকতে হবে। আমরা যেটা কল্পনা ভাবি, অসম্ভব ভাবি সেগুলো তোমাদের ভিতরের অফুরন্ত শক্তিতে বাস্তব আর সম্ভব হয়ে উঠবে। তরুণদের আমরা সমাজ সংস্কারক হিসেবে দেখতে চাই। নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার কেশব রায় তোমাদের মতোই একজন তরুণ। কিন্তু নিজের শক্তির উপর দাঁড়িয়ে সে যা করেছে তা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আর রাজা রামমোহন রায়ের মতো মানুষদের সঙ্গেই তুলনীয়। তরুণ কেশব রায় এখন দৃঢ়চিত্তে বলতে পারেন:“এখন পর্যন্ত ১২৯টি বাল্যবিয়ে ঠেকিয়েছি। যাদের বিয়ে ঠেকাতে পেরেছি, তাদের মধ্যে অনেকেই এখন উচ্চশিক্ষায় নিয়োজিত রয়েছে। কেউ কেউ দক্ষ উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছে।” খুব সহজ কাজ এটি নয় বরং অসম্ভব একটা কাজ। কিন্তু তার তারুণ্যের শক্তিতে অসম্ভব সম্ভব হয়ে উঠেছে। সমাজের কল্যাণের মহান ব্রত অন্তরে লালন করে তিনি আশেপাশের গ্রামগুলোতে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পথনাটক দেখানো শুরু করেন। যে নাটকগুলোতে তুলে ধরা হয় বাল্যবিয়ের ফলে সৃষ্ট বিভিন্ন সমস্যার কথা। মেয়েদের কী ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় বিয়ের পরে, সেগুলোও দেখানো হয় এই পথনাটকগুলোতে। তরুণদের বলবো তোমরা কেবল চাকরির পিছনে ছোটো না; বরং তুমি উদ্যোক্তা হলে কিংবা নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তুলতে পারলে চাকরি তোমার পিছনে ছুটবে।

তরুণদের হতাশ হলে চলবে না। বরং নিজেদের শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে উদ্যোক্তা হয়ে উঠতে হবে। এর মাধ্যমে অন্য তরুণদের কর্মসংস্থানের দায়িত্ব নিতে হবে। দেশ তোমাদের কী  দিল সেটি বড় কথা নয়। বরং দেশকে তোমরা কী দিলে সেটিই বড় কথা। মার্কিন ধনকুবের ওয়ারেন বাফেট তরুণ উদ্যোক্তাদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু উপদেশ দিয়েছেন। তিনি তরুণদের উদ্দেশে বলছেন, তা-ই করো তুমি যা করতে ভালোবাসো, এমন কোনো ব্যবসায় বিনিয়োগ করো না যা তুমি বোঝ না, তোমাকে সফল হবার জন্য অনেক কম কাজ করতে হবে যদি না তুমি অনেকগুলো কাজ ভুল করো, মিশতে হবে সঠিক মানুষদের সঙ্গে, অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হবে, নিজের ওপর আস্থা রাখতে হবে, সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে হবে, নিজেকে উন্নত করতে হবে, না বলা জানতে হবে, কখনো পুরোপুরি নিঃস্ব হওয়া যাবে না, ঋণকে যতটা সম্ভব উপেক্ষা করতে হবে, হাতে সবসময় নগদ অর্থ রাখতে হবে, সমাজকে তার প্রতিদান দিতে হবে। আমাদের তরুণ উদ্যোক্তাদের কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে এ ধরনের বিষয়গুলো বিবেচনায় আনতে হবে। তরুণদের বলব, তোমাদের চিন্তার জগত্টা যতটা পারো বাড়িয়ে নাও। কারণ তোমাদের চিন্তাই পৃথিবী বদলে ফেলতে পারে। প্রযুক্তির পরিবর্তনের সাথে নিজেদের সবসময় আপডেট রাখার চেষ্টা করো। গবেষণায় মন দাও। শিক্ষায় মন দাও। এগুলোর মাধ্যমে তোমরা নিজের চিন্তাশক্তি বের করে এনে নতুন নতুন প্রযুক্তি ও শিল্পায়নের মাধ্যমে দেশকে সমৃদ্ধ করো। সাহিত্যকে ভালোবাসো, দেশকে ভালোবাসো, মানুষকে ভালোবাসো। একা কখনো এগুনো যায় না। বরং তোমাদের এগিয়ে যেতে হলে তোমাদের আশপাশের মানুষদের এগিয়ে নিতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে বন্দুকধারী সন্ত্রাসীদের হামলায় ৫০ জন নিহত হয়েছেন। এই হামলায় অল্পের জন্য রক্ষা পায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়রা। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ড আরডার্ন বলেছেন, এটি নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসের কলঙ্কময় দিনগুলোর একটি। সন্ত্রাসীদের স্থান নিউজিল্যান্ডে নেই। আটক হামলাকারীদের একজন উগ্রবাদী অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক ব্রিন্টন ট্যারান্ট বলে নিশ্চিত করেছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন। আমাদের দেশে একটি অপশক্তি তরুণদের নিয়ন্ত্রণে এনে এধরনের সন্ত্রাসী কাজগুলোতে উত্সাহিত করছে। যা কখনোই কাম্য নয়। এজন্য তরুণদের বলব, তোমরা ধর্মান্ধ হয়ো না। বর্ণবাদী হয়ো না। জঙ্গিবাদে নিজেদের জড়িয়ে মানবসভ্যতাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না। তোমাদের নিজেদের বিবেকের দ্বারা তাড়িত হও, অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ো না। সন্ত্রাসের মতো মাদকও এক ভয়ঙ্কর শত্রু তারুণ্যের। এজন্য তোমাদের বলব, মাদকের ক্রীতদাসে পরিণত হয়ো না। তোমার ব্যক্তিত্ব নিয়ে তুমি উঠে দাঁড়াও। কারো কাছে মাথা নত করো না, তোমার জীবন জয়ের লড়াইটা তোমাকেই চালিয়ে যেতে হবে। এতে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত এলেও লক্ষ্য থেকে একটুও সরে এসো না। বরং লক্ষ্য অর্জনের পথে আরো শক্তি নিয়ে এগিয়ে যাও। কারণ ইতিহাস তরুণদের গড়ে না, বরং তরুণরাই ইতিহাস গড়ে।

n   লেখক: অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর