মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিন, চট্টগ্রাম অফিস
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় সাঙ্গু ও ডলু নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে এসব স্থানে চলমান নদী তীর সংরক্ষণ কাজ। যত্রতত্র বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তীর সংরক্ষণে বসানো বালুর বস্তা ও ব্লক ধসে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা।
এদিকে, যথাসময়ে প্রকল্পের কাজের অর্থ ছাড় দেওয়া হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজে ঢিলেমি করছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। এখন পর্যন্ত মাত্র তিন শতাংশ কাজ হয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে আগামী বর্ষায় নদী দুটিতে তীব্র ভাঙন দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সাতকানিয়া—লোহাগাড়ার লক্ষাধিক মানুষ।
পাউবোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দুই দফায় চলতি অর্থবছরে প্রাপ্ত বরাদ্দের অর্থ ছাড় দেওয়া হয়েছে। পরের কিস্তির জন্য মন্ত্রণালয়ে চাহিদা পাঠিয়েছে প্রকল্প কর্মকর্তা। ঠিকাদারদের বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও তারা প্রকল্পের কাজে ঢিলেমি করছে। এখন নিয়োগপ্রাপ্ত ঠিকাদারকে বাদ নিয়ে নতুনভাবে প্রক্রিয়া করতে কয়েক মাস সময় লেগে যাবে। এতে প্রকল্পের কাজ আরো দীর্ঘায়িত হবে। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প কর্মকর্তা বিদ্যুত্ কুমার সাহা ইত্তেফাককে বলেন, দ্রুত কাজ করার জন্য ঠিকাদারদের কয়েকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। আগামী জুনের মধ্যে প্রকল্পের ১০ শতাংশ কাজ সম্পন্নের জন্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ রয়েছে। আমিলাইশ ও নলুয়া ইউনিয়নের মুক্তারকূল এলাকায় প্রকল্পের কাছে নদী থেকে বালু উত্তোলন করে বিক্রি হচ্ছে। এর ফলে নদী ভাঙন প্রতিরোধে নির্মিত কাজ হুমকির মধ্যে পড়বে। ব্লক ও বালুর বস্তা নদীতে ধসে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি আমি স্থানীয় এমপি, জেলা প্রশাসন ও পাউবোর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি।
মুক্তারকূল এলাকায় নদী থেকে বালু উত্তোলনের কথা স্বীকার করে স্থানীয় নলুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তসলিমা আকতার বলেন, কিছু দুর্বৃত্ত রাতের বেলায় নদী থেকে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করছে। বিষয়টি এমপি মহোদয় ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানিয়েছি। আমিলাইশে নদী থেকে অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলন প্রসঙ্গে ইউপি চেয়ারম্যান এম. হানিফ বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজের জন্য বস্তা ভর্তির জন্য নদীর চর থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এই সুযোগে কিছু লোক বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির জন্য বালু উত্তোলনের চেষ্টা করছিলেন। তাদের কার্যক্রম প্রশাসন বন্ধ করে দিয়েছে।
প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৭-২০১৮ সাল উল্লেখ থাকলেও প্রকল্প অনুমোদন ও টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কয়েক মাস সময় লেগে যায়। ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ রয়েছে। গত বছরের শুরু থেকে মাঠ পর্যায়ে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। ১২টি প্যাকেজে ভাগ করে প্রকল্পের ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দেখা গেছে কয়েকটি প্যাকেজের কাজে সামান্য পরিমাণে বালু ভর্তি বস্তা তৈরি করলেও বাকি প্যাকেজের কাজে হাতও দেয়নি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রকল্পের কাজে ধীরগতির কারণে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পুরো প্রকল্পের মধ্যে সাতকানিয়া উপজেলার উত্তর বামন ডেঙ্গা, তুলাতলী, আমিলাইশ ও মইশামুড়া প্যাকেজের ভাঙন প্রতিরোধ কাজে চলছে সীমাহীন ঢিলেমি। এসব স্থানে দৃশ্যমান কোন কাজ দেখা যায়নি।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাইট ইঞ্জিনিয়ার আলমগীর হোসেন বলেন, আমাদের শুরুতে যে আর্থিক সংকট ছিল তা কেটে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের মান যাচাই কমিটির কার্যক্রমের কারণে প্রকল্পের কাজে দেরি হচ্ছে। বস্তায় বালু ভর্তি থেকে ডাম্পিংয়ের জন্য চূড়ান্ত অনুমোদন পেতে তিন মাস লেগে যায়। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে আবার বাড়ানোর আবেদন করব। বর্তমানে সাতকানিয়ার চারটি প্যাকেজের জন্য প্রায় সাড়ে তিন লাখ বস্তা বালুর প্রয়োজন হবে। মোস্তফা এন্ড সন্স নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তিনটি প্যাকেজের কাজ করছে। তাদের কাজের পরিমাণ ২২ শ’ মিটার। তাদের কাজ অত্যন্ত ধীরগতিতে হচ্ছে। তিনটি প্যাকেজের জন্য মোট ২ লাখ ৪০ হাজার ব্লক ও ১ লাখ ৩০ হাজার বালুর বস্তার প্রয়োজন। প্রকল্পের সাইট ইঞ্জিনিয়ার মো. রুবেল বলেন, ইতোমধ্যে ১৩ হাজার ৩৭০ বস্তা বালু ফেলা হয়েছে। আরো ১৯ হাজার প্রস্তুত করা হয়েছে। ব্লক এখনো তৈরি হয়নি। বালুর বস্তা ও ব্লক প্রস্তুত করে ডাম্পিংয়ের জন্য অনুমোদন পেতে কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হয়। কারণ জায়গা খালি না হলে নতুন করে বস্তা ও ব্লক তৈরির কাজ শুরু করা যাচ্ছে না।
আনোয়ার ল্যান্ডমার্ক নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দু’টি প্যাকেজের কাজ পেয়েছে। তাদের কাজের পরিধি ১৬০০ মিটার। প্রতিষ্ঠানের সাইট ইঞ্জিনিয়ার রাজু আহমেদ জানান, আমাদের ১১টি পয়েন্টে কাজ রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি পয়েন্টে কাজ শুরু করেছি। ব্লক তৈরি ও বালুর বস্তা প্রস্তুতির কাজ চলছে। পাউবো জানায়, বোর্ডের চলমান প্রকল্পের কার্যক্রমের মান যাচাই করার জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে একজন চিফ ইঞ্জিনিয়ার পদমর্যাদার কর্মকর্তার নেতৃত্বে একটি কমিটি রয়েছে। কমিটির প্রায় ৮০ জন সদস্য রয়েছে। তারা প্রকল্পের বালুর বস্তা, ব্লকসহ অন্যান্য উপকরণের মান পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাইয়ের পর প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দেন।
এ প্রসঙ্গে বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী শওকত ইবনে শহীদ ইত্তেফাককে বলেন, কাজের গুণগত মান বজায় রাখতে হলে সঠিক ভাবে মান যাচাই করা প্রয়োজন। এতে একটু সময় লাগলেও কাজের মান ভালো হবে।