বৈজ্ঞানিক গবেষণার আলোকে রোজা

 
রমযান মাসের রোজা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে চতুর্থ। আল্লাহর কাছে রোজা এতটাই গুরুত্ব বহন করে যে, হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘রোজা আমার জন্য এবং আমিই এর প্রতিদান দিব’।
 
রোজা পালন করতে গিয়ে একজন মুসলিমের রমযান মাসের প্রতিদিন সূবেহ সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার ও শারীরিক সম্পর্ক থেকে বিরত থাকতে হয়। এছাড়াও মুসলিমরা এই সময় সকল প্রকার ঝগড়া-বিবাদ, মিথ্যা কথা বলা থেকে বিরত থেকে নিজেদের মনকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে।
 
 এ কারণে রোজা যে শুধু মাত্র আধ্যাত্মিক উন্নতিই সাধন করে তা নয়, বরং শারীরিক ও মানসিক উন্নতিও ঘটায়।
 
জীব বিজ্ঞানের গবেষণার ফলে আমরা জানি যে, প্রতিটি প্রাণীর শরীর একটি উচ্চতর এবং সুক্ষ্ম জৈবরাসায়নিক কারখানা এবং এটিকে সচল রাখতে প্রয়োজন হয় শক্তি। উক্ত শক্তির যোগান দিতে স্রষ্টা জীবজগতের জন্য নানা প্রকারের খাদ্যদ্রব্যের ব্যবস্থা করেছেন। সাধারণত: একজন মানুষের এই শক্তি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে কমপক্ষে দৈনিক তিন বার খাদ্য দ্রব্য গ্রহণ করতে হয়। তবে মানুষ উন্নত আত্মা সম্পন্ন জীব হওয়ায় মানুষের সঙ্গে অন্যান্য পশুর পার্থক্য হলো মানুষ তার ক্ষ্মুত্-পিপাসা এবং যৌন প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। রমযান মাস প্রকৃতপক্ষে মানুষকে নিজের প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করার শিক্ষা দেয়।
 
প্রশ্ন হল, রোজার সময় দিনের বেলা পানাহার থেকে বিরত থাকা আমাদের শরীরকে কিভাবে প্রভাবিত করছে। রোজা আমাদের শরীরের জন্য কি আদৌ উপকারী, না কি রোজা আমাদের শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অনেক মুসলিম এবং অমুসলিম বিজ্ঞানী এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোন থেকে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ও গবেষণা চালিয়েছেন এবং চালাচ্ছেন। আলোচ্য প্রবন্ধে বৈজ্ঞানিক গবেষণার আলোকে রোজার অবস্থান সম্পর্কে আমরা জানতে চেষ্টা করবো।
 
স্বাস্থ্যের উপর পরিমিত খাবারের প্রভাব
 
আমাদের খাদ্যদ্রব্যের পরিমাপে র সুবিধার্থে যে একক ব্যবহার করা হয় তাকে ক্যালরী বলে। ম্যাক কে এবং তার সহযোগী বৈজ্ঞানিক দলের গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, দৈনন্দিন খাদ্যদ্রব্য হিসেবে গৃহীত মোট ক্যালরীর পরিমাণ কমিয়ে আনা হলে জীবনকাল বাড়ে। ১৯৮৯ সালে নিউট্রশন জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণার পর অনেক বিজ্ঞানী ক্যালরী রেস্ট্রিকটেড ডায়েট এবং বিভিন্ন ধরণের ফাস্ট (তথা উপোস থাকা)-এর উপর গবেষণায় আগ্রহী হয়ে উঠেন। লক্ষণীয় ইসলাম ব্যতীত অন্যান্য ধর্মেও বিভিন্ন ধরণের উপোস থাকার ধর্মীয় রীতির প্রচলন আছে। যেমন-অর্থোডক্স ক্রিশ্চিয়ানদের ক্যালরী রেস্ট্রিকটেড ফাস্টিং-যেখানে দৈনন্দিন গ্রহীত খাবারের ৪০% কমিয়ে আনা হয়, অল্টারনেট ডে ফাস্টিং-যেখানে একদিন পরপর ২৪ ঘন্টার জন্য পানি ব্যতীত সব ধরণের খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হয়।
 
ক্যালরী রেস্ট্রিকশনের উপর গবেষণা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, দিনের গৃহীত ক্যালরীর পরিমাণ কমিয়ে আনলে তা শারীরিক স্থায়িত্ব বাড়ায় এবং বেশ কিছু জটিল  অসুখের ফলে সৃষ্ট জটিলতা কমিয়ে আনে। যেমন-রক্তনালীতে চর্বি জমে সৃষ্ট অ্যাথেরোস্ক্লোরোসিস, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হূদরোগ, কিডনি রোগ এবং নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ।
 
রোজায় মানবদেহের শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন
 
মানব শরীরে যে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক উপাদান নিয়ে গঠিত তা হল:আমিষ, শর্করা, চর্বি, ভিটামিন, মিনারেল ও পানি। মানুষের দৈনন্দিন কাজ কর্মে যে শক্তি ব্যয় হয় তা আসে খাদ্য থেকে। সাধারণত: খাদ্য গ্রহণ এবং শক্তি ব্যয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় থাকতে হয়। দীর্ঘ দিন ধরে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ করলে শরীরে তা অতিরিক্ত মেদ হিসেবে জমা হয় এবং প্রয়োজনের চেয়ে কম খাদ্য গ্রহণ করলে শরীরের স্বাভাবিক গঠন ভেঙ্গে যেতে থাকে। যেহেতু মুসলিমদের দীর্ঘ একটি মাস রোজা রাখতে হয়, স্বাভাবিকভাবেই এতে ওজন কিছুটা হ্রাস হয়। তবে সাহরী ও ইফতার নামক সুন্দর ব্যবস্থার কারণে এই ওজন কমে যাওয়ার হার আশংকাজনক পর্যায়ে হয় না। রোজার সময় মানবদেহে শারীরবৃত্তীয় কি কি ধরণের পরিবর্তন হয় তা জেনে নিলে আমাদের জন্য মানবদেহে রোজার প্রভাব বুঝতে সুবিধা হবে।
 
রোজার সময় সাহরীতে যে খাবার গ্রহণ করা হয় তা সারাদিনের উপোষের প্রাথমিক সঞ্চয় হিসেবে লিভারে শর্করা জমা হতে সাহায্য করে। এরপর দিনের কাজ কর্মের মধ্য দিয়ে যে শক্তি ব্যয় হয় তার একটি অংশ উক্ত শর্করা হতে আসে এবং একটি অংশ আসে রমযান মাসের পূর্বে এবং রমযান মাসে ইফতার থেকে সাহরী পর্যন্ত খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে শরীরের এডিপোজ টিস্যুতে জমাকৃত চর্বি বিপাকের মাধ্যমে। ফলে রমযান মাস শেষে একজন রোজাদারের শরীরের কিছুটা ওজন হ্রাসও হতে পারে। তবে তা নির্ভর করছে ইফতার ও সাহরীর সময় এবং তত্মধ্যবর্তী সময়ে রোজাদারের খাদ্যাভ্যাসের উপর। লক্ষণীয়, অন্যান্য সময় মুসলিমরা তিনটি প্রধান মিল (সকাল, দুপুর ও রাতের খাবার) গ্রহণ করলেও রমযানে দুটো প্রধান মিল (সাহরী ও ইফতারের খাবার) গ্রহণ করে।
 
গবেষণায় দেখা গেছে যে, রমযান মাসে মুসলিমদের খাবারের সময়ের সাথে সাথে খাবারের ধরণেও বেশ পরিবর্তন আসে। আমাদের দেশে রমযান মাস এলে ইফতারের সময় আলুর চপ, পেয়াজু, বেগুনী জাতীয় ভাজাপোড়া খাবারের সাথে হালিম, ছোলা, মুড়ি ইত্যাদি খাওয়া হয়। এছাড়া খেজুরসহ বিভিন্ন ফল ও ফলের রস, চিড়া, দধি, কলা প্রভূতি খাবার গ্রহণ করা হয়। বিরিয়ানী, তেহারী, পোলাউ জাতীয় খাবার গ্রহণের প্রবণতাও বেড়ে যায়। জনাব জি ফ্রস্ট ও এস পিরানী ১৯৮৭ সালে ১৫ জন সৌদি যুকবের উপর গবেষণা চালিয়ে দিখেন যে, রমযান মাসে যদিও তাদের খাবার গ্রহণের বারের সংখ্যা কমে গিয়েছে, অপরদিকে শর্করা, প্রোটিন এবং চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণের পরিমাণ বেড়ে গিয়েছে। রোজার সময় যেহেতু পানি পান থেকেও বিরত থাকতে হয়, সেহেতু দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় পরে ঘাম, মল ও মূত্রের মাধ্যমে পানির পরিমাণ কমে যায়। এ অবস্থায় বিভিন্ন হরমোনের মাধ্যমে কিডনি রক্তে পানি ধরে রাখার চেষ্টা করে।
 
শরীরের চর্বি ও ওজনের ওপর রোজার প্রভাব রোজারত মুসলিমদের শরীরের চর্বি, ওজন এবং বডি ম্যাস ইনডেক্স নিয়ে বিজ্ঞানীরা অনেক গবেষণা চালিয়েছেন। তাদের গবেষণার ফলাফল মিশ্র পাওয়া গিয়েছে। অর্থাত্, কোন পরীক্ষায় দেখা গেছে, রমযান মাস শেষে রোজাদারদের ওজন হ্রাস পেয়েছে, কোনটায় অপরিবর্তিত আছে এবং কোনটায় ওজন বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মূল কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, রোজায় মানুষের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন। যদিও দিনের বেলা তারা না খেয়ে থাকছে, ইফতারের সময় বেশি পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করছে। এছাড়া সাহরীর সময়ও বেশী ক্যালরী সঞ্চয় করে নেয়ার জন্য বেশী খাচ্ছে। ২০১২ সালে ট্রাবেলসী এবং তার সহযোগীরা দুই ধরণের রোজাদারদের ওপর গবেষণা চালান। যাদের একদল ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তে এরোবিক এক্সারসাইজ যেমন-সাইকেল চালানো ও সাতার কাটা অনুশীলন করেছেন এবং আরেক দল ইফতারের পর একই অনুশীলনগুলো করেছেন। তারা দেখেন যে, রোজা শেষে প্রথমোক্ত দলের শরীরের চর্বি কমলেও পরবর্তী দলে তা অপরিবর্তিত রয়েছে।
 
২০১৩ সালে ঐ একই বিজ্ঞানীদের গ্রুপ তিউনিশিয়ান বডি-বিল্ডারদের উপর গবেষণা চালিয়ে দেখা যায় যে, রোজা শেষে তাদের বডি ফ্যাট ও লিন বডি ম্যাস (চর্বিহীন শরীরের মূল ওজন)-এ কোন পরিবর্তন আসে নি। এর কারণ হিসেবে ধারণা করা হয় যে, বডি-বিল্ডিং-এ শক্তির খরচ তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় এ রকম হয়েছে।
 
সুতরাং উপরোক্ত গবেষণাগুলো থেকে ধারণা করা হয় যে, রমযান মাসে ইফতার ও সাহরীর সময় খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে ওজন কমবে। যাদের বডি ম্যাস ইনডেক্স আদর্শ সীমা অতিক্রম করে গেছে যা ২৪ ও তার বেশী, তারা রমযান মাসকে ওজন কমানোর জন্য একটি উত্তম সময় হিসেবে নিতে পারেন। 
 
 
লেখক:পরিচালক
দি লিভার সেন্টার, ঢাকা, বাংলাদেশ
মির্জা গোলাম হাফিজ রোড
বাড়ী নং-৬৪, রোড নং-৮/এ
ধানমন্ডি, ঢাকা