ভোজনরসিক বাঙালির পাতে পাবদা মাছের বিশেষ গুরুত্ব আছে, তেমনই সুস্বাদু গুলশা, টেংরা, শিং, মেনি, গুতুম, গুজি আইড়, চিতল, ফলি, মহাশোল মাছ। বিলুপ্তির হুমকিগ্রস্ত মিঠাপানির এসকল মাছ আবারও মত্স্য বাজার আলোকিত করিতেছে। দামও নাগালের ভিতরে। আর যে মাছটি এখন আমজনতার মাছ হইয়া উঠিয়াছে, সেই ইলিশের কথা তো বলিতেই হইবে। নূতন নূতন অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার ফলে ক্রমাগত বাড়িতেছে ইলিশের উত্পাাদন। এই উত্পাদনযজ্ঞে নেতৃত্ব দিতেছে মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই)। মাছ উত্পাদনে বাংলাদেশের স্বয়ংসম্পূর্ণতার পিছনে এবং বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির মাছ ফিরাইয়া আনিতে অভূতপূর্ব সাফল্য দেখাইয়াছেন প্রতিষ্ঠানটির গবেষকরা। ২০০৪ হইতে ২০১৭ সনের মধ্যে বাংলাদেশের মত্স্য উত্পাদন ৫৭ শতাংশ বাড়িয়াছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, বর্তমানে দেশের জিডিপিতে মত্স্য খাতের অবদান ৩ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২৪ দশমিক ৪১ শতাংশ।
বর্তমানে দেশে ৮০০ প্রজাতির মাছ ও চিংড়ি আছে। তন্মধ্যে ২৬০ প্রজাতি মিঠাপানির ও ৪৭৫ প্রজাতি সামুদ্রিক। এইগুলির মধ্যে ২৮ প্রজাতির মিঠাপানির মাছ বিলুপ্তির পথে। বিলুপ্তির ঝুঁকিতে আছে আরও ৫৪ প্রজাতি। তবে, বিলুপ্তপ্রায় ২২ প্রজাতির মিঠাপানির মাছ আবারও ফিরিয়া আসিয়াছে। বিভিন্ন নদ-নদী ও অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে গঠিত অভয়াশ্রমেই মূলত এসকল বিলুপ্তপ্রায় মাছের পুনরাবির্ভাব ঘটিয়াছে। অন্যদিকে, গত এক দশকে বিএফআরআই বিলুপ্তপ্রায় ১৮টি মাছের প্রজনন এবং চাষাবাদ কৌশল উদ্ভাবন করিতেও সক্ষম হইয়াছে। ইহারই সামগ্রিক প্রভাব পড়িয়াছে মত্স্য উত্পাদনে, অর্থনীতিতে এবং সর্বোপরি জনস্বাস্থ্যে। কিছু পরিসংখ্যান আমরা খেয়াল করিতে পারি: জাতিসংঘের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৮ সনে অভ্যন্তরীণ মত্স্য উত্পাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে উন্নীত হইয়াছে। চীন ও ভারতের পরেই এখন বাংলাদেশের অবস্থান। ২০১৭ সাল পর্যন্ত এই অবস্থান ছিল পঞ্চম। ২০১৭-১৮ সনে প্রায় ৬৯ হাজার মেট্রিক টন মত্স্য ও মত্স্যজাত পণ্য রফতানি করিয়া সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হইয়াছে। বড় ধরনের এই অগ্রগতির পিছনে মূল অবদান ছিল ইলিশের। জাটকা নিধন রোধের কার্যকারিতার ফলে ২০১৭-১৮ সনে প্রায় ৫ লক্ষ টন ইলিশ উত্পাদিত হইয়াছে, ২০০৮-০৯ সালে যাহা ছিল মাত্র ৩ লক্ষ টন। মত্স্য উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ায় প্রাণিজ আমিষের ৫৮ শতাংশ মাছ দিয়া চাহিদা মিটাইয়া শীর্ষস্থানীয় দেশের কাতারে এখন বাংলাদেশ। বিশ্বে গড়ে প্রাণিজ আমিষের ২০ শতাংশ আসে মাছ হইতে।
কিন্তু দেশের ১২ শতাংশ মানুষ মত্স্যচাষে জড়িত হইলেও আর্থিক প্রণোদনা পান কেবল রপ্তানিকারকেরাই। মত্স্যচাষিরা কৃষিঋণের মাত্র ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পান। আবাদী কৃষকেরা ডিজেল ও বিদ্যুতে ভর্তুকি পান। মাছচাষিরা তাহাও পান না। তাহাদের জন্য কোনো হিমাগারও নাই। এইদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। প্রাকৃতিক উত্সগুলিতে মাছের উত্পাদন বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখিতেছেন। বাংলাদেশ মত্স্য ইনস্টিটিউট হইতে ইতোমধ্যে মত্স্য চাষ ও ব্যবস্থাপনা-বিষয়ক ৬০টি প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হইয়াছে। তন্মধ্যে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির ১৮টি মাছের পোনা উত্পাদন করিয়াছে প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞানীরা। ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত এইসকল প্রযুক্তি মত্স্য অধিদপ্তর ও বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণের ফলে উত্পাদন বাড়িয়াছে বিপুলভাবে। আমরা তাহার সুফল ভোগ করিতেছি। সংগতকারণেই বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণের প্রচেষ্টাগুলিকে আরও উত্সাহিত করা একান্ত কর্তব্য।