মানুষের মস্তিষ্কটাকে কম্পিউটার প্রসেসরের মতই ধরা হয়ে থাকে। এর একটি নির্দিষ্ট প্রসেসিং পাওয়ার রয়েছে আর রয়েছে বুদ্ধিমত্তাও। এই বুদ্ধিমত্তা আমরা কে কতখনি ব্যবহার করব তা নির্ভর করছে আমাদের ওপর। কোন কাজ শেষ করতে, সমস্যার সমাধান করতে, মনোযোগ দিতে, সৃজনশীল কাজে প্রয়োজন এই বুদ্ধিমত্তার। কিন্তু কিছু কিছু চিন্তার ভুল, মানসিক দ্বন্দ্ব ধীরে ধীরে কমিয়ে দেয় বুদ্ধি বা আইকিউ।
যে কোন জটিল কাজ করার সময় আমাদের যদি অতিরিক্ত বুদ্ধি খরচের প্রয়োজন পড়ে তাহলে তার বিরূপ প্রভাব পড়ে আমাদের মনোযোগ দেয়ার ক্ষমতা এবং ফোকাসের ওপর। সাময়িকভাবে আমাদের আইকিউ কমে যায়।
যেমন, আমরা যদি হাঁটতে হাঁটতে ১০০০ থেকে পেছনের দিকে ৭ বাদ দিয়ে গুণতে শুরু করি অর্থাৎ ১০০০, ৯৯৩, ৯৮৬ এভাবে এগিয়ে যেতে থাকি তাহলে একসময় হাঁটা থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ব। কারণ মস্তিষ্ক একই সঙ্গে দুই দিকে মনোযোগ দিতে পারবে না। কিন্তু কাজটি যদি এত জটিল না হত তাহলে একইসঙ্গে করা যেত। যেমন, আমরা গান শুনতে শুনতে অংক করতে পারি। খেতে খেতে বই পড়তে পারি।
আমাদের মানসিক কিছু অভ্যাস আছে যা আমাদের একই সঙ্গে দুই দিকে মনোযোগ দিতে দেয় না। আমরা যদি এগুলো সম্পর্কে সচেতন হই তাহলে নিজেদের যোগ্যতাকে আরও বাড়াতে পারব, আরও জটিল সমস্যা সমাধানে পারদর্শী হতে পারব। আসুন জেনে নিই এই মানসিক অভ্যাসগুলোর কথা।
১। গভীর চিন্তা
একজন মানুষ যদি সর্বোক্ষণ হতাশা এবং বিষন্নতায় ভোগে এবং নেতিবাচক চিন্তা করতে থাকে তাহলে এর বিরূপ প্রভাব মস্তিষ্কে পড়ে। আমরা যখন স্ট্রেসড থাকি তখন অনেক স্বাভাবিক বিষয়ও ভুলে যেতে থাকি। ছোট-খাট অনেক ভুল করতে থাকি যা করার কথা নয়। কারণ গভীর মানসিক চাপ আমাদের মনোযোগ ব্যাহত করে। শুধু মানসিক নয়, এর অনেক শারীরিক কুপ্রভাবও আছে।
২। সমাধান না হওয়া আত্মগ্লানি
আমাদের জীবনে বিভিন্ন রকম ভুল আমরা করি। সেগুলো আমাদের মধ্যে এক ধরণের আত্মগ্লানি তৈরি করে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলোর কোন সমাধান নেই। এমনকি এমনও অনেক সময় হয় যে, আমাদের দোষ না থাকা স্বত্ত্বেও আমরা নিজেদের দোষী মনে করি। এতে আমাদের মন ভারাক্রান্ত থাকে। নিজেকে দোষী মনে করে সারাক্ষণ কষ্টে থাকা ধীরে ধীরে নিজেকে শেষ করে দেয়ার সামিল। এই সমস্যার সবচেয়ে ভাল সমাধান হল, ক্ষমা চাওয়া এবং নিজেকে আত্মগ্লানি থেকে মুক্তি দেয়া।
৩। অকারণ অভিযোগ
কিছু ক্ষেত্রে রাগ প্রকাশের কোন মানে নেই। এমন অনেক ঘটনার সম্মুখীন আমাদের হতে হয়, যেগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিন্তু আমরা সেগুলোতে রাগ প্রকাশ করবোই, এটা যেন নির্ধারিত সত্য। শুধু তাই নয়, একই ঘটনা আমরা যতবার বর্ণনা করি ততবার আমরা রেগে যাই। এতে অনেক শক্তি খরচ হয়। যেসব অভিযোগের কোন সমাধান নেই সেসব অভিযোগ আমাদের দুর্বল বোধ করায়, আত্মবিশ্বাস কমায়। এতে মনোযোগ দেয়া, বুদ্ধি প্রয়োগের ক্ষমতাও হ্রাস পায়। তাই যত আমরা স্বাভাবিকভাবে পরিস্থিতিকে গ্রহণ করব তত আমাদের সুযোগ তৈরি হবে তাকে নিয়ন্ত্রণ করার। মাথা ঠাণ্ডা রেখে প্রতিকূল অবস্থা বুদ্ধি খাটিয়ে নিজের আয়ত্বে নিয়ে আসতে পারব।
৪। দুশ্চিন্তা করা
আমাদের মধ্যে বেশীরভাগ মানুষই চিন্তা করাকে ক্ষতিকারক মনে করেন না। অথচ অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা এক প্রকারের ব্যাধি। দুশ্চিন্তা আমাদের বুদ্ধি প্রয়োগের ক্ষমতাকে হ্রাস করে। ক্রমাগত দুশ্চিন্তা করা একটি অভ্যাসে পরিণত হয়। এমন অনেক মানুষ আছেন যারা অল্প সমস্যাতেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে আর কোন সমাধান তো পানই না, অন্যদেরকেও সমস্যায় ফেলে দেন। অনেকে কোন কারণ ছাড়াই দুশ্চিন্তা করে রাতে ঘুমাতে পারেন না। এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই মানসিক রোগের চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হওয়া উচিৎ।
৫। অগ্রহণযোগ্যতা
আমরা কোথাও নিজেদের অগ্রহণযোগ্যতা মেনে নিতে পারি না। আশানুরূপ প্রবেশাধিকার না থাকলে আমরা হতাশা বোধ করি। এই অভ্যাস আছে সব মানুষেরই। নিজেদের জন্য 'না' শব্দটি আমরা চাই না। যুক্তির বদলে আমরা আবেগ দিয়ে বিচার করি তখন। কখনো কখনো নিজের সমালোচনা করি। কখনো বা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠি। ফলাফল নেই এমন প্রতিটি আচরণ আমাদেরকে ক্ষতিগ্রস্থ করে, বুদ্ধি কমায়।
সবকিছুর সহজ সমাধান হল, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী। জীবন সম্পর্কে বাস্তব বোধ আমাদেরকে অনেক দূর এগিয়ে নিতে পারে।