সভ্যতার নতুন সংকট

মেজর জেনারেল মো. আব্দুর রশীদ (অব.)

গত ১৫ মার্চ শুক্রবার পৃথিবীর শান্তির দেশ হিসাবে পরিচিত দক্ষিণ ভারত মহাসাগর অঞ্চলের শ্বেতাঙ্গ অধ্যুষিত দেশ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত আল নূর মসজিদে জুম্মার নামাজের সময় মুসল্লিদের অত্যাধুনিক উজি আধা স্বয়ংক্রিয় রাইফেল নিয়ে উন্মাদের মতো এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করে এবং নিকটবর্তী এলাকা লিনউডে আরেকটি মসজিদে গিয়েও হামলার পুনরাবৃত্তি করে মোট  ৫০ জন নিরীহ নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে সারা পৃথিবীর মানুষকে চমকে দেয় ঘাতক। নিউজিল্যান্ডবাসী অবাক হয়। বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দল আল নূর মসজিদে নামাজ আদায়ের কথা থাকলেও ভাগ্যের জোরে হামলা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পায় এবং ক্ষয়ক্ষতি এড়িয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকায় পরবর্তী টেস্ট খেলা বাদ দিয়েই দেশে অক্ষতভাবে ফেরত চলে আসে। যা বাংলাদেশের জন্য স্বস্তি বয়ে আনলেও ক্রাইস্টচার্চ শহরে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে কমপক্ষে পাঁচজন নিহত হবার এবং আহত অনেকেই এখনও হাসপাতালে চিকিত্সাধীন থাকায় দেশে সবাই শোকাহত হয়েছেন।

গত দশক ও সাম্প্রতিককালে  আল-কায়েদা এবং ইসলামিক স্টেটের  জিহাদের নামে নিরীহ মানুষ হত্যার জঙ্গিবাদ দেখে অভ্যস্ত জনগণ শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অভিবাসীবিদ্বেষী এবং  ইসলামবিদ্বেষী জঙ্গিবাদ তেমন প্রত্যক্ষ করেনি। যদিও টুইন টাওয়ারের হামলার পর থেকে অনেক দেশেই ‘হেট ক্রাইমে’র সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি অনেকটাই ক্ষুণ্ন হয়। জাতিগত ও ধর্মীয় সম্প্রীতি খানিকটা হলেও বিঘ্নিত হয়ে পারস্পরিক ঘৃণার সংস্কৃতির বিস্তার ঘটে। শ্বেতাঙ্গ বিশ্বে ভিনদেশি সংস্কৃতির উপস্থিতিতে অনেক শ্বেতাঙ্গ নিজেদের অস্তিত্বের উপর কল্পিত ঝুঁকিতে আতঙ্কিত হয়ে উগ্র জাতীয়তাবাদের দিকে ঝুঁকে পড়তে থাকলে রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার বাহন হিসাবে দ্রুত উগ্র জাতীয়তাবাদকে আঁকড়ে ধরায় ঘৃণার চর্চা উত্সাহিত হয়ে সম্প্রীতি বিনষ্ট হয়ে উগ্র জাতীয়তাবাদ সহজেই সহিংস হতে রাজনৈতিকভাবে বাধাহীন হয়েছে। ফলে আগামীদিনে সম্ভাব্য সভ্যতার সংঘাত বিশ্বকে নতুন সংকটে জড়িয়ে ফেলে আরেকটি অস্থিতিশীলতার পঙ্কিলে পতিত করে নতুন শঙ্কার জন্ম দিলো। কারণ ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে হামলার মধ্যে শ্বেতাঙ্গ হামলাকারী যুবক হামলার মনস্তত্ত্ব প্রকাশ করেছে ৭৪ পাতার এক ইশতেহারের মাধ্যমে। যেখানে হিংসার নতুন দুটি উপাদান নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে। প্রথমটি ভিনদেশিবিদ্বেষ ও দ্বিতীয়টি ইসলামবিদ্বেষ। ভিনদেশিদের উপস্থিতি স্থানীয়দের মাঝে বহুমুখী বিদ্বেষ ছড়িয়েছে বলে অনুমিত হলেও অভিবাসন সংশ্লিষ্ট দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে অভিবাসন পৃথিবীতে একটি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনসংখ্যার স্বল্পতার কারণে শ্রমিক সংকট উত্তরণে অভিবাসন একটি কার্যকর উপায় হিসাবে বিবেচিত। কিন্তু তার বদলে নেতিবাচক বিষয়গুলোকে উঁচিয়ে ধরে মানুষের জাতিগত বিদ্বেষকে উসকে দেবার প্রবণতাকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। বিশ্বের অনেক দেশ কপি ক্যাট হামলার আশঙ্কায় মসজিদের নিরাপত্তা জোরদার করেছে।   

সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান দখল করার পর আল-কায়েদা ও তালেবান জঙ্গিদের জন্ম হয় সরাসরি সম্মুখযুদ্ধ ব্যতিরেকে  শত্রু নিধনের নতুন সস্তা উপায় হিসেবে। পরে ইরাক ও সিরিয়াতে ইসলামিক স্টেট নামের আরেকটি জঙ্গি রূপান্তর সমগ্র বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। টুইন টাওয়ারের হামলার পর একদিকে জঙ্গিবিরোধী যুদ্ধ সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, অপরদিকে জিহাদের মতাদর্শকে উঁচিয়ে ধরে জঙ্গিবাদ মুসলিম বিশ্বে শেকড় গেড়ে বসে শক্তভাবে। বিশুদ্ধ ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে নিরীহ মানুষ হত্যা শুরু হয়। ধর্মীয় জঙ্গিবাদের সাথে ইসলাম ধর্মের তকমা লেগে যায়। সারাবিশ্ব থেকে জিহাদের ডাকে হাজার হাজার মুসলিম তরুণ উন্মাদের মতো সিরিয়ার দিকে ছুটতে থাকে। মুসলিম ও অমুসলিম বিশ্ব সমানভাবে আক্রান্ত হয়। ইউরোপ ও আমেরিকাসহ সারা পৃথিবীতে জঙ্গি হামলা বাড়তে থাকে, সাথে অমুসলিম ও মুসলিমদের নিহত হবার সংখ্যাও বাড়তে থাকে সমানভাবে। বিশ্বে নিরাপত্তার চরম সংকট দেখা দেয়। অনেক রাষ্ট্র শত্রু রাষ্ট্রকে শায়েস্তা করার জন্য পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে জঙ্গিদের লালন পালন শুরু করে এবং তাদেরকে দিয়ে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের নতুন ও সস্তা উপায় হিসেবে বেছে নিলে পৃথিবীতে জঙ্গিবাদের নতুন ও বর্বর রূপ দৃশ্যমান হয়। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে প্রভাবিত করতেও জঙ্গিবাদের ব্যবহার শুরু হয়। বাংলাদেশেও রাজনীতিতে প্রভাব সৃষ্টি করার জন্য জঙ্গিবাদকে ব্যবহারের অপচেষ্টা দেখা গেছে। ধর্মের নামে ঘৃণাকে উপজীব্য করে বিভাজনের রাজনীতি করে ভোটের বাক্সভর্তি করে ক্ষমতায় আরোহন করার উপায় হিসেবে ব্যবহার করে সফল না হলেও অনেক দেশ জঙ্গিবাদকে পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করলে জঙ্গিবাদের ঝুঁকি মোকাবিলা অত্যন্ত জটিল সমীকরণে পরিণত হয়ে যায়। উগ্র জাতীয়তাবাদের সাথে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধি উল্লেখযোগ্য উপকরণ হিসেবে ডানপন্থি উগ্রবাদের জন্ম ঘটাচ্ছে। সিরিয়াতে আল-কায়েদা ক্রমেই ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে। অপরদিকে উগ্র জাতীয়তাবাদকে উপজীব্য করে জঙ্গিবাদের নব্য উত্থান এবং তার পেছনের রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকদের উদ্দেশ্য ও কৌশল অনুধাবন ও উন্মোচন যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। নিউজিল্যান্ডের জঙ্গিবাদের শেকড় ক্রাইস্টচার্চে সীমাবদ্ধ নয়, এটা সত্য। উগ্র জাতীয়তাবাদের বীজ কতটুকু বিস্তৃত হয়েছে বিশ্বব্যাপী তা নির্ণয় করা ছাড়া এই নতুন জঙ্গিবাদকে দমন করা যাবে না। বিশ্বের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকেই ঘৃণার সংস্কৃতিকে উত্পাটন করে সম্প্রীতিকে এগিয়ে নেবার দায় কাঁধে নিতে হবে। সভ্যতার সংঘাত শুরু হলে বিশ্ব ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যাবে এবং নিরীহ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা চরমভাবে বিঘ্নিত হবে। কেউ নিজেকে এই নতুন ঝুঁকি থেকে মুক্ত ভাবার কোনো যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। জঙ্গিবাদকে উসকে দিয়ে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে না। প্রকৃতি বা মতাদর্শ যাই হোক, জঙ্গিবাদকে স্বার্থসিদ্ধির উপায় ও ব্যবহারকে সমভাবে রুখতে হবে বাংলাদেশের মতো শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি অনুসরণ করে। ভারতের পুলওয়ামার জঙ্গি হামলাকে বাহ্বা দিয়ে ক্রাইস্টচার্চের হামলার পুনরাবৃত্তি রোধ করা যাবে না। জঙ্গি লালনকারী রাষ্ট্র এবং বিরাষ্ট্রীয় শক্তি ও উগ্রবাদী রাজনীতিকে নিবৃত করতে না পারলে ধর্ম ও বর্ণ বিদ্বেষের আবরণে জঙ্গিবাদ নতুন চেহারায় বারে বারে আবির্ভূত হবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন রূপ নিয়ে। 

ক্রাইস্টচার্চের জঙ্গি হামলার প্রকৃতি ও রূপ নতুনভাবে আবর্তিত হচ্ছে। বিদ্বেষের বিশ্বায়ন ঘটার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ইদানীং উন্নত বিশ্বে উগ্র জাতীয়তাবাদকে ভর করে সৃষ্ট বিদ্বেষভিত্তিক ভোটের রাজনীতি ক্ষমতায় আসীনের সহজ পথ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় অনেক রাজনৈতিক দল ও নেতা সে পথেই হাঁটছেন। মূলত শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের নামে ভিনদেশি ও ইসলাম বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতেই অস্ট্রেলীয় শ্বেতাঙ্গ যুবকের এই সহিংসতা ও বর্বরতা। জেনোফোবিক ও ইসলামোফোবিক হামলার বিস্তার বিশ্বকে নতুন করে অশান্ত করে তুলতে পারে এবং সভ্যতার সংকট তৈরি করবে— বিধায় এই নতুন হিংসাত্মক মনস্তত্ত্বকে বাড়তে দেয়া যাবে না। তাই ঘৃণার এই মতাদর্শকে খুব সযত্নে দমন করতে হবে সবাইকে একত্রিত হয়ে।

সভ্যতার সংকট এড়াতে জঙ্গিবাদের প্রশ্রয় নয়। জঙ্গিবাদের কোনো ধর্ম, বর্ণ বা মতাদর্শ নেই। জঙ্গিবাদ মানবতাবিরোধী হিংসাত্মক একটি পন্থা— যা সমাজের সম্প্রীতি বিনষ্ট করে সামাজিক বিভাজনকে উসকে দিয়ে সভ্যতাকে ধ্বংসের দিকে ধাবিত করে। মসজিদের হামলাকে ভিত্তি করে বিভিন্ন অনুমানভিত্তিক তথ্য বিকৃত করে প্রতিহিংসার উন্মাদনা তৈরি নয়। কারণ হামলাকারীর ধর্মীয় বা বর্ণ পরিচয় দিয়ে জঙ্গিবাদের প্রকৃতি নির্ণয় করা ভুল হবে। তাই মানবতাকে উঁচিয়ে ধরে সামনে এগুতে হবে। হামলাকারী উগ্র ডান জাতীয়তাবাদে উন্মাদ হয়ে হামলা করেছে, কিন্তু সভ্যসমাজে সে স্থান করে নিতে পারেনি। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন—এই হামলা দেশের কালো অধ্যায়। সেখানকার সাধারণ মানুষ ফুল দিয়ে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে, যেমন দেখেছিলাম বাংলাদেশে হলি আর্টিসান বেকারিতে ভিনদেশিদের হত্যার পর বাংলাদেশের জনগণ ফুল দিয়ে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে একত্রিত হয়েছিল।  অনেকেই মসজিদে শ্বেতাঙ্গ হামলাকে ধর্মের রঙ চড়িয়ে ধর্মযুদ্ধের দামামা বাজাচ্ছেন। বাংলাদেশেও আইএসের অনুসারী জঙ্গি দল মসজিদে হামলা করেছে, পাকিস্তানে মসজিদের হামলায় সবচেয়ে বেশি মুসল্লি নিহত হয়েছেন।  ক্রাইস্টচার্চ হামলায় স্ত্রী হারানো বাংলাদেশি ফরিদ আহমেদ হামলাকারীকে ক্ষমা করে দিয়ে সম্প্রীতির এক অসাধারণ উদাহরণ হয়ে উঠেছেন। প্রতিহিংসা ইসলামের ধারণা নয়। তাই বিশ্বে শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে স্বজন হারিয়েও প্রতিহিংসা নয়, ঘৃণা নয়— ক্ষমা ও ভালোবাসাই আগামী পৃথিবীর চালিকাশক্তি হোক।

n লেখক: স্ট্রাটেজি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক। ইন্সটিটিউট অব কনফ্লিক্ট, ল’ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিস (আই ক্লাডস) এর নির্বাহী পরিচালক