স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায়!

আরাফাত শাহীন

স্বাধীনতা শব্দটি শুনলেই বুকের ভেতর দিয়ে কেমন যেন অদ্ভুত এক শীতল হাওয়া বয়ে যায়। মনে হয়, আমি জীবনের মানে খুঁজে পেয়েছি; আমার হূদয়ের শত আকুতি প্রিয় কোনো ফুলের মতো প্রস্ফুটিত হতে পেরেছে। নিজেকে ধন্য মনে হয় তখন। আসলে জীবনের মানেই কি স্বাধীনতা? কিংবা যদি উল্টো করে বলি, স্বাধীনতা মানেই কি জীবন? হয়ত তাই হবে। তা না হলে মানুষ কেন স্বাধীনতার জন্য এমন পাগলপারা হতে পারে? শুধু মানুষ কেন, এই পৃথিবীর কোনো প্রাণীই কি পরাধীন অবস্থায় বেঁচে থাকাকে মেনে নিতে পারে? বনের পাখি এমনিতেই অতি সুন্দর। আপনি তাকে ধরে এনে খাঁচায় পুরে রাখলেন। তার আদর-যত্নেরও কোনো কমতি রাখলেন না। দামি দামি সব খাবার বরাদ্দ রইল তার জন্য। তবুও কি সে একটা মুহূর্তের জন্য নিজেকে সুখী ভাবতে পারবে? কোনো রাজপ্রাসাদই পাখির বুকে সুখ এনে দিতে পারবে না। একমাত্র মুক্তিই তাকে সুখী করে তুলতে পারে।

বনে বসবাস করা একটা পাখি যদি বুঝতে পারে স্বাধীনতার মানে, তাহলে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ হয়ে মানুষ কেন সেটা উপলব্ধি করতে পারবে না? পৃথিবীর সমস্ত মানুষই স্বাধীনতা পেতে চায়। কবির কণ্ঠে তাইতো বারবার এ আক্ষেপ ঝরে পড়েছে: ‘স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায়?’ আসলে পরাধীন হয়ে বেঁচে থাকার মতো লজ্জা আর কিছুতেই হতে পারে না। কিন্তু স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাইলেই কি সেটা সম্ভব? না, কিছুতেই না। বরং স্বাধীনতা পেতে হলে চাই দীর্ঘ সংগ্রাম এবং সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষা।

ব্রিটিশরা এদেশে প্রায় দু’শ’ বছর তাদের শাসন-শোষণ অব্যাহত রেখেছিল। তারপর একদিন তারা ভারত এবং পাকিস্তান নামে দুটি দেশকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে চিরতরে বিদায় নিয়ে চলে গেল। ব্রিটিশদের বিদায়ের পর আমরা ভেবেছিলাম, এবার বুঝি স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়া যাবে। কিন্তু ভাগ্যের লিখন ছিল একেবারেই অন্যরকম। আমরা জ্বলন্ত উনুন থেকে এসে পড়লাম ফুটন্ত কড়াইয়ে।

ভারত এবং পাকিস্তান নামে আলাদা দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সৃষ্টির পর আমাদের জুড়ে দেয়া হলো পাকিস্তানের সঙ্গে। অথচ পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের যেমন ছিলো ভৌগোলিক দূরত্ব, তেমনি সাংস্কৃতিক দূরত্বও কম ছিল না। তারপরও এদেশের মানুষ নিয়তিকে মেনে নিয়েছিল। কিন্তু শাসকচক্রের চিন্তাধারা ছিল একেবারেই আলাদা। এদেশের মানুষের ওপর শুরু থেকেই তারা নির্যাতনের পথ বেছে নিলো। নানাভাবে বাঙালির জাতিসত্তাকে মুছে ফেলার ঘৃণ্য চক্রান্ত হয়েছে। আমাদের ভাষার ওপর আঘাত আসে সর্বপ্রথম। বুকের তাজা রক্ত দিয়ে সেই আঘাতের মোকাবিলা করেছেন আমাদের মহান পূর্বপুরুষেরা। পাকিস্তানি শোষকেরা আমাদের মায়ের ভাষাকে মুছে ফেলতে পারেনি। আমরা সেটা করতে দিইনি। শুধু ভাষার ওপরেই নয়, এই জাতির ওপর পাকিস্তানিরা যেসব লজ্জাজনক বিষয় চাপিয়ে দিয়েছিল তা আমরা মেনে নিতে পারিনি কিছুতেই। ফলে অনিবার্যভাবেই সংঘাত বাধে পাকবাহিনীর সঙ্গে। সে যুদ্ধ ছিল সর্বগ্রাসী এবং সাংঘাতিক। রাতের আঁধারে ঠিক চোরের মতো এসে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হানাদারবাহিনী ঘুমন্ত মানুষের ওপর আক্রমণ শুরু করে। এমন নির্লজ্জ বর্বরতা এর আগে পৃথিবীবাসী কখনও দেখেনি। খুন, ধর্ষণ আর রাহাজানিতে ভারি হয়ে উঠতে থাকে রাতের বাতাস। স্বাধীনতার জন্য পাগল হয়ে ছুটতে থাকে মানুষ। কত রক্ত, আর কত ত্যাগের পর অবশেষে স্বাধীনতা নামক সোনার হরিণটি এসে ধরা দিলো আমাদের মাঝে। আমরা পেলাম একটি পতাকা, একটি দেশ এবং একটি জাতি হিসেবে বাঁচার অনুপ্রেরণা।

স্বাধীনতার পর বহু বছর পেরিয়ে গিয়েছে আজ। একটি ভগ্ন রাষ্ট্র থেকে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য আমাদের উদয়াস্ত পরিশ্রম চলছে। আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। তবে আমরা জাতি হিসেবে আমাদের স্বাধীনতার প্রতি তেমন একটা সচেতন নই। আজও বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত আমাদের এই সমাজ। জাতি হিসেবে আরও বহুদূরে যাবার কথা ছিল আমাদের। কিন্তু আমরা সেটা করে দেখাতে পারিনি। এই ব্যর্থতার দায় অবশ্যই আমাদের কাঁধে তুলে নিতে হবে। আমরা চাই, স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি প্রজন্ম গড়ে উঠুক আমাদের মাঝে। আমরা এমন একটি প্রজন্ম চাই, যারা দেশ থেকে অন্যায় ও অবিচারকে পুরোপুরি নির্মূল করে দিতে পারবে। তবেই তো আমরা স্বাধীনতার স্বাদ পুরোপুরি উপভোগ করতে পারব। একটি দেশ হিসেবে আমাদের আগামীর পদযাত্রা অব্যাহত থাকুক।

n লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়