জুয়েনা আক্তার
আমাদের সমাজের নানা অসঙ্গতি নিয়ে ভাবতে গিয়ে হূদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। সে রক্তক্ষরণ হয়ত বিমূর্ত কিন্তু যে ক্ষত সৃষ্টি হয় তা বাস্তব। ভাবতে গিয়ে চোখের কোণে ভেসে ওঠে কোনো এক বৃদ্ধ মা কিংবা বাবার করুণ বেদনায় ভারাক্রান্ত চেহারা। যাদের হাসির অন্তরালে ভেসে ওঠে কষ্টের প্রতিচ্ছবি, চাপা কান্নার আওয়াজ। লজ্জা, ভয়, অপমান, অনাদর আর যন্ত্রণায় পিষ্ট হয়ে যারা দিনাতিপাত করছে আর মৃত্যুর প্রহর গুনছে তাদের সম্পর্কে আজ কিছু বলতে চাই। আর বলতে চাই সে সন্তান সম্পর্কে যারা বৃদ্ধ পিতা-মাতার করুণ আর্তনাদ হূদয় দিয়ে কখনও অনুভব করে না, যারা ভুলে গেছে তাদের অতীতকে, তাদের বেঁচে থাকার পেছনে বাবা-মায়ের অবদানকে।
পিতা-মাতার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক জন্মসূত্রে তৈরি। কিন্তু এমন মধুর সম্পর্কের বিচ্ছেদ আর তিক্ত বাস্তবতার মঞ্চায়ন ঘটছে বর্তমান সমাজে। যে পিতা-মাতা তাদের জীবন, অর্জিত সম্পদ ব্যয় করেছেন সন্তানের ভবিষ্যত্ গড়ার জন্য, সে সন্তান আজ বৃদ্ধ, অসহায়, শিশুসুলভ পিতা-মাতাকে তুলে দিচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে। অধিকাংশ পরিবারে বৃদ্ধ পিতা-মাতার সঙ্গে রূঢ় আচরণ করা হয়। দিনের পর দিন লাঞ্ছনা, গঞ্জনা আর অপমান সহ্য করতে হয় পিতা-মাতাকে। ভয়ে হয়তো টু-শব্দটিও করেন না কেননা তারা নিজেকে অক্ষম ভাবেন, বোঝা ভাবেন। অনেকে হয়তো সন্তানের গলগ্রহ হয়ে বেঁচে থাকতে চান না।
একটিবার নিজেকে ভেবে দেখুন সে জায়গায়। নিঃসঙ্গতা যখন আপনার বাস্তবতা হবে, প্রাণপ্রিয় সন্তানেরা যখন অবহেলা করবে, শারীরিকভাবেও যখন আরও অক্ষম হতে থাকবেন, সেই সময়টাতে মৃত্যুর প্রহরগুলো কিভাবে গুনবেন! এখনই একটু কল্পনা করুন। কেননা আজ সেই অবস্থায় রয়েছেন আপনার পিতা-মাতা। তাদের আর্তনাদ, চাপা কান্নার আওয়াজ হূদয় দিয়ে শুনার চেষ্টা করুন। সন্তান হিসেবে এটা আপনার দায়িত্ব।
পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন নামে ২০১৩ সালে যে আইনটি সংসদে পাস হয়েছে, সেটির সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকারি পর্যায়ে হাসপাতালে ও ক্লিনিকে বিশেষ ব্যবস্থাও করতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, জীবনের সঙ্গে আমরা হয়তো অতিরিক্ত বছর যোগ করতে পেরেছি, কিন্তু বাড়তি বছরগুলোতে জীবন যোগ করতে পারিনি। তাই, প্রবীণদেরকে, বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা দিতে হবে। প্রতিটি সন্তানকে হতে হবে বৃদ্ধ পিতা-মাতার সবচেয়ে বড় সম্বল। তথাকথিত বৃদ্ধাশ্রম নয়, প্রতিটি সন্তানের ঘর হোক পিতা-মাতার বৃদ্ধাশ্রম।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়