বিশ্বের দ্বিতীয় অশান্তিময় দেশটি হচ্ছে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক। দেশটিতে এখনো চলছে জাতিগত সংঘাত। এখানকার মানুষ প্রতিপক্ষের কাউকে পেলে পাখির মতো গুলি করে মেরে ফেলে। ভারী অস্ত্র দিয়ে গোলাগুলি করাটা এখানকার লোকজন রীতিমত উত্সব বলে মনে করে। এতেই তারা আনন্দ পায়। নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতা তাদের অস্তিত্বে মিশে গেছে, যেখানে কোনো মানবিকতার স্থান নেই। এ পরিস্থিতিতে দেশটিতে জাতিগত যুদ্ধ বহুদিন ধরেই চলে আসছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সেখানে যাওয়ার পর জাতিসংঘের তত্ত্বাবধায়নে চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে চার ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান সেখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শান্তিপূর্ণভাবে সেই নির্বাচন পরিচালনা করে। এটি জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনের জন্য একটি দৃষ্টান্ত। দেশটির লোকজনকে বর্বরতা এবং নির্মমতা থেকে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শান্তি স্থাপনের কৌশল বেছে নেয়। তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলছে তারা, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সেখানকার লোকজনকে সম্পৃক্ত করছে।
জাতিগত বিরোধকে কেন্দ্র করে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। পরবর্তীতে পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় জাতিসংঘ সেখানে শান্তি রক্ষা মিশন চালু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ২০১৪ সালে ১৪ সেপ্টেম্বর মিনুস্কা (MINUSCA) মিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তি রক্ষীরা দেশটিতে কাজ শুরু করে। দেশটির সংঘাত নিরসনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অত্যন্ত দক্ষতা, পেশাদারিত্ব এবং আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে সেদেশের সরকার এবং আপামর জনসাধারণের আস্থা অর্জন করতে সমর্থ হয়েছে। এখানে পানির সমস্যা প্রকট। রয়েছে বিদ্যুতের সমস্যাও। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এসব সমস্যা নিরসনে কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চৌকস সদস্যরা।
সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে (সিএআর) দায়িত্বরত বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের কার্যক্রম পরিদর্শনে মেজর জেনারেল আতাউল হাকিম সরোয়ার হাসানের নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ১৯ জুন ওই দেশে যায়। প্রতিনিধি দলটি সেখানে পাঁচদিন অবস্থান করে। মিনুস্কা মিশনের প্রধানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রতিনিধি দলের প্রধান বৈঠক করেন। কর্মকর্তারা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব, মানবিকতা এবং দেশটির অশান্ত মানুষকে যেভাবে শান্তির পথে তারা ফিরিয়ে আনছে, তার প্রশংসা করেন। প্রতিনিধি দলের সদস্যরা সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কর্মরত বাংলাদেশের চারটি ব্যাটালিয়নের সদস্যদের সঙ্গে তাদের সমস্যা, সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে কথা বলেছেন। সেখানে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়টি নিয়েও তারা কথা বলেন। আলাপকালে জাতিসংঘ শান্তি মিশনের কর্মকর্তারা বাংলাদেশি শান্তি রক্ষীদের প্রশংসা করেন।
উঁচুনিচু পাহাড়, সমতল ভূমি আর সবুজ ছায়া ঘেরা এই দেশটি প্রকৃতিক সম্পদে ভরপুর। মাটি খুবই উর্বর। দেশটির আয়তন ২ লাখ ৪০ হাজার বর্গমাইল। এটি বাংলাদেশের মোট আয়তনে ৪ দশমিক ২ গুণ বেশি। রাজধানীর নাম বাঙ্গী। শিক্ষার হার ৫০ শতাংশ। মুদ্রার নাম সেফা। সাংহো এবং ফরাসি এই দুইটি ভাষা প্রচলিত। দেশটির জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ। প্রতিবছরই প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। মজার ব্যাপার হলো এখানকার মানুষ ভাত শাকসবজি চেনে না। খাবারের অভাবে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটে তাদের। অথচ গাছে আম ধরে থাকে বার মাস। কিন্তু তারা আম খায় না। যতসব অদ্ভুত খাবার তাদের পছন্দ। যেগুলো সচরাচর পাওয়া যায় না। লোকজনের পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার বালাই নেই। গোসল করে মাসে একবার। কোনো বিলাসিতারও ধারে কাছেও নেই দেশটির মানুষজন।
জনসংখ্যা প্রায় ৫৩ লাখ। গড় আয়ু ১৯ বছর ৪ মাস। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ১৫-৪৯ বছর বয়সী জনগণের মধ্যে ১১ শতাংশ এইডস ভাইরাস বহন করে। সম্পূর্ণ জাতি প্রায় ৮০টি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীতে বিভক্ত। দেশটিতে প্রচুর পরিমাণে হিরা, ইউরোনিয়াম, তেল এবং সোনার খনি রয়েছে।
দেশটির একটি মাত্র প্রধান সড়ক রয়েছে। রাজধানী বাঙ্গী থেকে ক্যামেরুন পর্যন্ত ৬১০ কিলোমিটার সড়কটির কোথাও পাকা, আবার কোথাও আধা পাকা। সড়কের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক।
দেশটির মানুষগুলোর মধ্যে মানবিকতা নেই বললেই চলে। এখানে দুটি শক্তিশালী গ্রুপ রয়েছে। একটি নাম এক্স সেলেকা এবং অন্যটির নাম অ্যান্টি বালাকা। গ্রুপ দুটি প্রায় সবসময়ই সংঘর্ষে লিপ্ত থাকে। কথায় কথায় গুলি করে মানুষ মেরে ফেলে। আদিম বর্বর প্রকৃতির এসব মানুষকে সামাজিক করার চেষ্টা করছে শান্তিরক্ষীরা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীরা এদেরকে ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত করে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার চেষ্টা করছে।
এছাড়া বাংলাদেশের বিভিন্ন উত্সব এবং জাতীয় দিবসে ওই দেশের লোকদের দাওয়াত দেয়া হয়। এতে করে তাদের মধ্যে জাতীয়তাবোধ, মমত্ববোধ এবং সামাজিক হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে বলে জানা গেছে।