বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা দিনভর রাজপথে

নিরাপদ সড়কের দাবিতে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা গতকাল বুধবারও দিনভর রাজপথে ছিলেন। টানা দ্বিতীয় দিনের মতো সকাল থেকে রাজধানীর প্রগতি সরণি, কুড়িল, রামপুরা, উত্তরা, শাহবাগ, সদরঘাটসহ বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। নিরাপদ সড়কের দাবিতে বিভিন্ন শ্লোগান দেন। এদিকে আন্দোলনের কারণে রাজধানীতে গণপরিবহনের সংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম। এতে সকাল থেকেই ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। তবে ভোগান্তি হলেও অনেকেই এ আন্দোলনের পক্ষে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তারা বলেছেন সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আইনের কঠোর বাস্তবায়ন জরুরি।

দিনভর বিক্ষোভ শেষে বিকালে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এর শিক্ষার্থীরা আগামী ২৮ মার্চ পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত রাখার ঘোষণা দেন। এর আগে দুপুরে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র ও ডিএমপি কমিশনারের সঙ্গে আলোচনা করেন শিক্ষার্থীদের কয়েকজন প্রতিনিধি। সেখানে তাদের দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাসের প্রেক্ষিতে আন্দোলন স্থগিত করা হয়। তবে বিইউপির শিক্ষার্থীদের আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা মেনে নেননি আন্দোলনরত অন্য চার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তারা আজ থেকে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।

গত মঙ্গলবার সকালে প্রগতি সরণি এলাকায় সুপ্রভাত বাসের চাপায় বিইউপির শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী নিহত হন। পরে সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা নিরাপদ সড়কের দাবিতে ৮ দফা দাবি তুলে ধরেন।

গতকাল সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর প্রগতি সরণি, কুড়িল, রামপুরা, উত্তরা, শাহবাগ, সদরঘাটসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক আটকে বিক্ষাভ করেন শিক্ষার্থীরা। ফলে সড়কে গণপরিবহনের আধিক্য ছিল কম। ব্যক্তিগত গাড়িও খুব বেশি চলাচল করেনি। তবে সিএনজি আটোরিক্সা ও রিকশা চলাচল করেছে। তবে একই সময় রাজধানীর কোনো কোনো এলাকার চিত্র ছিল একেবারই বিপরীত। রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় গণপরিবহণের চাপে দীর্ঘ যানজট দেখা গেছে।

বিইউপির শিক্ষার্থীরা সকাল থেকেই যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করেন। এসময় তাদের সঙ্গে যোগ দেন আইইউবি, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাকার্ড ও জাতীয় পতাকা নিয়ে বিক্ষোভ করেন। তাদের ‘নিরাপদ সড়ক চাই’, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘ভাইয়ের বুকে রক্ত কেন’, ‘প্রশাসনের প্রহসন মানি না মানব না’, ‘জেগেছে রে জেগেছে ছাত্রসমাজ জেগেছে’, ‘সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধ হোক’ ইত্যাদি শ্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে উঠে পুরো এলাকা। এসময় বিউপির শিক্ষার্থী ও আবরারের সহপাঠীরা বলেন, ‘আমাদের আর কোনো সহপাঠীর মরদেহ আমরা সড়কে দেখতে চাই না। কোনো মানুষের মরদেহই দেখতে চাই না। সবসময় আমাদের আশ্বাস দেওয়া হয়। এবার আমরা এসবের বাস্তবায়ন চাই।’ তারা আরো বলেন, ‘সরকার যদি পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা ঢেলে না সাজাতে পারে তাহলে তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো দরকার নেই।’

সকাল ৯ টার দিকে রামপুরা ব্রিজে এসে অবস্থান নেন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা। তারা সড়কের উপর বসে বিভিন্ন ধরনের শ্লোগান দিতে থাকেন। সকাল ১০ টার দিকে আইডিয়াল স্কুলের শিক্ষার্থীরা তাদের সঙ্গে যোগ দেয়।  এতে বিকাল পর্যন্ত ওই সড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ থাকে।

আবরারের নামে ব্রিজের ভিত্তি স্থাপন: এদিকে শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে গতকাল সাড়ে ১১টার দিকে ‘আবরার আহমেদ ফুটওভার ব্রিজের’ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র আতিকুল ইসলাম। এসময় আবরারের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) উপাচার্য মেজর জেনারেল মোহাম্মদ এমদাদুল বারী, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়াসহ ডিএনসিসি, ডিএমপি এবং বিইউপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কাছে গিয়ে তাদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন মেয়র ও ডিএমপি কমিশনার। তারা শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়ে শিক্ষার্থীদের সড়ক ছেড়ে শ্রেণিকক্ষে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করেন।

এসময় ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, গত মঙ্গলবার রাতেই আমরা জরুরি ভিত্তিতে সুপ্রভাত বাসের রুট পারমিট বাতিল করেছি। ঢাকা শহরে সুপ্রভাত পরিবহনের কোনো বাস চলবে না। ঘাতক বাসের চালককে গ্রেফতার করে মামলা রুজু করা হয়েছে। যেখানে-সেখানে বাস থামিয়ে যারা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরো বলেন, ট্রাফিক সপ্তাহ, ট্রাফিক পক্ষ এবং ট্রাফিক মাসের মতো আমাদের নিয়মিত কাজগুলো চলছে। বাস কোম্পানিগুলোকে ফ্রাঞ্চাইজি ব্যবস্থায় নিয়ে আসা হচ্ছে। এমনটা হলে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার চিত্রই পাল্টে যাবে।

এসময় মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিরাপদ সড়ক তৈরি করতে আমাদের সবাইকে নির্দেশ দিয়েছেন। ঢাকায় পাল্লা দিয়ে বাস চলবে- এমনটা আর হতে দেওয়া যাবে না। প্রয়োজনে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে দুই বা তিন জন করে প্রতিনিধি নিয়ে ইউনিট গঠন করে আমার কাছে আসুন। আপনাদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে, আপনাদের সঙ্গে নিয়ে ঢাকার সড়ককে নিরাপদ করব আমরা।

মেয়র আরো বলেন, আমি আবরারের বাবা ও পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছি। এটা কত হূদয়বিদারক ঘটনা সেটা আমি বুঝি। এখানকার জনগণের, ছাত্রছাত্রীদের দাবি, এখানে একটি ফুটওভার ব্রিজ হোক। এর কার্যক্রম শুরু করে গেলাম। আগামী দুই মাসের মধ্যে এ ব্রিজের কাজ শেষ হবে। এ ব্রিজ আবরারের নামে হবে, আর এর উদ্বোধক হবেন তার বাবা।

আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা বিইউপি শিক্ষার্থীদের: গতকাল দুপুরে মেয়র আতিকুল ইসলাম ও ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়ার সঙ্গে বিইউপির ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল বৈঠক করে। বৈঠকে শেষে বিকালে সব দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাসে আগামী ২৮ মার্চ পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত রাখার ঘোষণা দেন বিইউপির শিক্ষার্থীরা। তারা জানান, আমাদের আলোচনায় তিনটি দাবিকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। এর মধ্যে ছিল ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে চালকের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির আদেশ দেওয়া, জাবালে নূর ও সুপ্রভাত বাসের রুট পারমিট বাতিল করা এবং রাজধানীর বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে জেব্রা ক্রসিং ও ফুটওভারব্রিজ স্থাপন করা। এসব দাবির বিষয়ে মেয়র ও ডিএমপি কমিশনার দ্রুত বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছেন। তারা বলেছেন, আইনের মধ্যে থেকে যত দ্রুত সম্ভব এগুলো বাস্তাবায়ন করা হবে। ২৮ মার্চ বেলা ১১টায় এই প্রতিনিধি দলের সঙ্গেই মেয়র ও ডিএমপি কমিশনার বিষয়টি নিয়ে ফলোআপ বৈঠক করবেন। ওইদিনের মধ্যে দাবি বাস্তবায়ন না হলে ২৯ মার্চ থেকে আবার সারাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা শিক্ষার্থীদের একটি অংশের :বিইউপি শিক্ষার্থীদের ঘোষণার সঙ্গে একমত হননি আন্দোলনরত নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা। তারা জানান, দোষী চালকের শাস্তিসহ ৮ দফা দাবি আদায়ে আজ বৃহস্পতিবার সকালেও তারা সড়ক অবরোধ করবেন। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী কাওসার হাবিব সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের সবগুলো দাবি নিয়ে প্রতিনিধি দল কথা বলেনি। যারা গেছে তারা সব দাবি নিয়ে কথা বলতে পারেনি। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সুপ্রভাত বাসচালকের শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া ও পাল্লাপাল্লি বাস চলাচল বন্ধসহ অন্যান্য দাবির দৃশ্যমান বাস্তবায়ন দেখতে চাই। না হলে আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাবো।

চালক ৭ দিনের রিমান্ডে: আবরার আহমেদ চৌধুরী নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় সুপ্রভাত পরিবহনের বাসচালক সিরাজুল ইসলামকে সাতদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল বুধবার ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক দেবদাস চন্দ্র অধিকারী এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন।