সাভার উপজেলার আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলটি ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। আশুলিয়া থানা এলাকায় সন্ধ্যার পরই বিভিন্ন অলিগলির মোড়ে ছিনতাই নিত্যদিনের ঘটনা। বাদ যাচ্ছে না সড়ক মহাসড়কও। গভীর রাতে সড়কে চলাচলরত গাড়িতে পাথর, ইটের টুকরা ও ডিম নিক্ষেপ করে কিংবা সড়কের উপর গাছের গুঁড়ি ফেলে গতিরোধ করে কেড়ে নেওয়া হয় যাত্রী ও চালকদের সর্বস্ব।
আশুলিয়ার বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়কের মরাগাং ও বেড়ীবাঁধ এলাকাটি সন্ধ্যার পর পরিণত হয় সন্ত্রাসী ও ছিনতাইকারীদের বিচরণভূমিতে। আর একটু সন্ধ্যা বা রাত নামলেই বিভিন্ন গলির মোড়ে অবস্থান নিয়ে অস্ত্রের মুখে সাধারণ মানুষের সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে তারা। সড়কের দুই পাশে অবস্থান নিয়ে একটি সংঘবদ্ধ গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে সুকৌশলে প্রাইভেটকারসহ বিভিন্ন যানবাহনে ঢিল ও পাথর ছুড়ে গাড়িতে ছিনতাই করে আসছে। ছিনতাইকারীদের বাধা দিতে গিয়ে ইতিপূর্বে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তাসহ সাধারণ মানুষ। পরে তাদের লাশ পাওয়া গেছে সড়কের পাশে ঝোপেঝাড়ে।
২৮ জানুয়ারি রাতে আশুলিয়ার বাইপাইল থেকে যাত্রীবেশে বাসে ওঠে ডাকাত দলের সদস্যরা। চালককে জিম্মি করে যাত্রীদের হাত-পা বেঁধে মারধর করে মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিয়ে নেমে যায়। গত বছর ২৩ অক্টোবর রাতে আশুলিয়ার মরাগাং এলাকায় জেলে সেজে চলন্ত মোটরসাইকেল ও পথচারীদের থামিয়ে ডাকাতি করে। এর আগে ১৮ সেপ্টেম্বর দিনে-দুপুরে একই স্থানে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের অতর্কিত হামলায় দুই হিজড়াসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়। এ ছাড়া ১৫ জুলাই একই এলাকা থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করলেও পুলিশ রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি। গত বছরের ২৮ মে রাতে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোশারফ হোসেনের প্রাইভেট কারে ঢিল ছুড়ে থামিয়ে তাকে ছুরিকাঘাত করে প্রাইভেট কারটি নিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
গত বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি ভোররাত ৪টার দিকে রাজধানীর এ্যাপোলো হাসপাতালে কাজ শেষে সাভারের বাসায় ফিরছিলেন ডা. রুবেল দেওয়ান (৩৮)। তার নিজস্ব প্রাইভেটকারটি আশুলিয়ার মরাগাং এলাকায় পৌঁছালে ‘ঢিল ছোড়া পার্টি’ নামে পরিচিত ছিনতাইকারীরা গাড়িটি লক্ষ্য করে ঢিল ছোড়ে। এসময় চালক গাড়ি থামিয়ে বেরিয়ে আসেন। এই সুযোগে ছিনতাইকারীরা তাকে ধরতে যায়। তিনি প্রাণভয়ে দৌড়ে পালাতে গেলে দ্রুতগামী একটি ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। এছাড়া ২০১৭ সালের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ায় চালক ও তার সহকারীকে হাত-পা বেঁধে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে পুলিশের রেশন বোঝাই ট্রাক ছিনতাই করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এভাবে প্রায় প্রতিদিনই মরাগাং ও বেড়ীবাঁধ সড়কে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে।
সড়কটিতে চলাচলরত দোয়েল-সিয়াম, আলিফ, মোহনা পরিবহন ও লেগুনার চালকরা জানান, আশুলিয়া ব্রিজ থেকে ধউর পর্যন্ত মরাগাং এলাকায় রাতের বেলায় তাদের ভীতি নিয়ে গাড়ি চালাতে হয়। কখন ছিনতাইকারীর ঢিল ছুটে আসে! নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পোশাক কারখানার মালিক জানান, নামিদামি বিদেশি বায়াররা এখন এ সড়কে চলাচল করতে ভয় পাচ্ছেন। প্রতিনিয়তই ‘ঢিল ছোড়া পার্টি’ তাদের গাড়ি লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়ছে। এ বিষয়টি একাধিকবার স্থানীয় থানা এবং পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবগত করা হলেও তারা কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না বলে তিনি অভিযোগ করেন।
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ রিজাউল হক বলেন, ‘ঢিল ছোড়া পার্টির’ শিকার কেউ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেননি। তবে একটি দুর্বৃত্ত চক্র আছে, যারা টঙ্গী থেকে এসে ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা ঘটিয়ে আবার চলে যায়। বিষয়টি পুলিশের নজরে এসেছে। ইতোমধ্যে পুলিশী তত্পরতার কারণে ৭ জনকে আটক করে মামলা দেওয়া হয়েছে। মরাগাং এলাকায় পুলিশের তিনটি টিম কাজ করছে।