নিরাপদ পানির সংকট সারাদেশেই

সরকারিভাবে রাজধানীবাসীর জন্য ‘বিশুদ্ধ পানি’ সরবরাহের দায়িত্বপ্রাপ্ত একমাত্র কর্তৃপক্ষ ঢাকা ওয়াসা। কিন্তু ওয়াসার পানি সরাসরি কল হইতে পান করিবার রীতি উঠিয়া গিয়াছে অনেক আগেই। ইহার পরিবর্তে বাসাবাড়িতে ওয়াসার পানি ফুটাইয়া ও ফিল্টার করিয়া পান করা হয়। কিন্তু ওয়াসার পানি ফুটাইবার সময় যদি তাহা হইতে ফেনার সৃষ্টি হয় ও দুর্গন্ধ ছড়ায়, তাহা হইলে ওয়াসার পানির ন্যূনতম উপযোগিতা থাকিবে কী করিয়া? সম্প্রতি এমন বিপদে পড়িয়াছেন শ্যামলীর ৪ নম্বর সড়ক এবং ধানমন্ডির কিছু অংশসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকার বাসিন্দারা। তাহারা অভিযোগ করিয়াছেন যে, দেড়-দুই মাস ধরিয়া পানিতে ময়লা ও দুর্গন্ধের মাত্রা প্রকট হইয়াছে। এই পানি ফুটাইয়া পান করিবারও উপায় থাকে না। কারণ, পানি ফুটাইলেই তাহাতে ফেনা তৈরি হয়। স্থানীয় পাম্পে এই বিষয়ে অভিযোগ জানাইয়াও তাহারা কোনো প্রতিকার পাইতেছেন না। ওয়াসার স্থানীয় কর্তৃপক্ষ অবশ্য জানাইয়াছেন যে, সায়েদাবাদের পানি শোধনাগারের একটি লাইন শ্যামলীতে আসিয়া মিশিয়াছে। সেইখান হইতেই নোংরা-দুর্গন্ধযুক্ত পানি আসিতেছে বলিয়া তাহারা অনুমান করিতেছেন।

কেবল ঢাকা শহর নহে, নিরাপদ পানির সংকট সারা দেশেই। জনস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ পানি কতখানি গুরুত্বপূর্ণ, তাহা নূতন করিয়া বলিবার কিছু নাই। সরকারিভাবে দাবি করা হয় যে, বাংলাদেশের ৮৭ শতাংশ মানুষ নিরাপদ পানির আওতায় আসিয়াছে আরো চার বত্সর পূর্বেই। বর্তমানে এই হার আরো বেশি। ২০৩০ সালের আগেই শতভাগ মানুষকে নিরাপদ পানির আওতায় আনিবার পরিকল্পনা রহিয়াছে সরকারের। কিন্তু আমরা জানি, এই কাজটি সহজ নহে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগর সভ্যতার ক্রমবিকাশ এবং প্রযুক্তিগত ভিন্নতায় পানি ব্যবহারের ধরনের পরিবর্তন হইয়াছে বিশ্বব্যাপী। বিশ্বের প্রায় শতকরা ৪০ ভাগ মানুষ কমবেশি সুপেয় পানি সমস্যায় ভুগিতেছেন। নিরাপদ পানির অভাবে পৃথিবীতে বত্সরে ১০ লক্ষ মানুষ মারা যায়, যাহাদের অধিকাংশই শিশু।  কেবল তাহাই নহে, বিশ্বের প্রায় ১০৭ কোটিরও বেশি মানুষ নদী অববাহিকায় বসবাস করিয়াও পানির চাহিদা মিটাইতে ব্যর্থ হইতেছেন। মনুষ্যসৃষ্ট ৮০ শতাংশেরও বেশি অপরিশোধিত বর্জ্যপানি প্রকৃতিতে ফিরিয়া গিয়া সৃষ্টি করিতেছে বড় আকারে পরিবেশ দূষণ। পরিতাপের বিষয় হইল, বিশ্বে এখনো সবচাইতে বেশি আর্সেনিক দূষণ আক্রান্ত মানুষ বাংলাদেশেই বসবাস করেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি সত্ত্বেও বাংলাদেশের প্রায় দুই কোটি মানুষ এখনো সহনীয় মাত্রার চাইতে বেশি পরিমাণে থাকা আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করিতেছে। ইহাছাড়া পানিতে ম্যাঙ্গানিজ, ক্লোরাইড ও লৌহ দূষণের কারণেও খাওয়ার পানির মান খারাপ থাকে। মলের জীবাণু রহিয়াছে এমন উেসর পানি পান করিতেছে বাংলাদেশে ৪১ শতাংশের বেশি মানুষ। আবার ঘরের কল বা টিউবওয়েলের আশপাশ পরিষ্কার না থাকিবার কারণে বিভিন্ন অণুজীবযুক্ত পানি পানকারীর সংখ্যাও প্রায় ১০ কোটির কাছাকাছি। কয়েক বত্সর পূর্বে তৈরি করা জরিপে নিরাপদ পানির এই চিত্রই প্রকাশ পাইয়াছে।

পানির অপর নাম জীবন—সবচাইতে পুরাতন চিরায়ত এই কথাটির প্রতিফলন যেন দেশের উন্নতির গ্রাফের সঙ্গে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। বিশুদ্ধ পানির সংস্থান ব্যতীত আমাদের উন্নয়ন টেকসই হইবে না।