যে সামাজিক ব্যাধি থেকে পরিত্রাণ জরুরি

আলম শাইন

বিষয়টা নিয়ে লিখতে হাত কাঁপছে। শরীর হিম হয়ে আসছে। তারপরেও লিখতে হচ্ছে। পর্নোগ্রাফির কথা বলছি। যেই ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে গোটা সমাজ কাঁপছে। যার করালগ্রাসে পড়ে কতিপয় কিশোর-যুবক অসভ্য আচরণ করছে। তারা নানাভাবে অনাচারে জড়িয়ে পড়ছে। মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলছে। ভালোমন্দ বাছবিচারের ক্ষমতা হারিয়ে অশোভনীয় আচরণ করছে মা-বাবা, শিক্ষক কিংবা পাড়ার ময়মুরুব্বিদের সঙ্গে। ফেসবুক এবং ইউটিউবের যুগে ‘রিভেঞ্জ পর্নো বা প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফিও ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে যেন এটিই এখন ধ্যানজ্ঞান একশ্রেণির কিশোরের কাছে।

বুক উঁচিয়ে বলতে পারি, কৈশর বয়স আমাদেরকেও পাড়ি দিতে হয়েছে, তবে আমরা এ ধরনের অনাচারে লিপ্ত হইনি। তখনকার সময়ের যুব সমাজ কিংবা কিশোর-যুবারা এত অশ্লীলতায় লিপ্ত ছিল না। কালেভদ্রে কেউ পর্নোছবি দেখলেও সেটি রাখঢাকের মধ্য দিয়েই দেখতে হতো। অবশ্য তখন হাতের কাছে এ ধরনের পর্নোগ্রাফি পাওয়াও যেত না। দেখতে হলে আয়োজন করেই দেখতে হতো। আর সে আয়োজনে বাধা হয়ে দাঁড়াতেন পাড়ার ময়মুরুব্বিরা। ফলে অনেক সময় বিপথগামী যুবকদের আয়োজন ভেস্তে যেত। সেক্ষেত্রে কিশোর বয়সীদের তো প্রশ্নই আসত না। আর হালে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ পরিলক্ষিত হচ্ছে। যুবকদের চেয়ে কিশোররা এগিয়ে আছে বেশি। এর প্রধান কারণই হচ্ছে ফোর জির আছর।

বলতে দ্বিধা নেই— খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ আগেও ছিল; কিন্তু সেটি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েনি। এখন খুন কিংবা ধর্ষণের কৌশল পাল্টে গেছে। অপরাধীরা প্রকাশ্যে দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করছে, ধর্ষণ করছে। এসব হচ্ছে কেন? এসব হচ্ছে অনেকটা ইউটিউবের কারণে। সিলেটের খাদিজার এবং কিশোর রাজনের ভিডিও তার জলন্ত প্রমাণ। কবরে লাশ রাখছে সেখানেও ভিডিও করতেই হবে। হজে গিয়ে কাবা শরীফ একহাতে ছুঁয়ে অন্যহাতে ভিডিও কিংবা ছবি তোলা হচ্ছে। এ হচ্ছে এখন আমাদের ধ্যানজ্ঞান। মানুষ মরে যায় যাক, তাতে কিছু যায় আসে না। ভিডিও করতেই হবে আগে। ফেসবুকে দিতে হবে, ইউটিউবে দিতে হবে, না হলে যে  ক্রেডিট নেওয়া যাচ্ছে না। অথচ এ দুইটি জিনিস একজন ভালো মানুষের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, অথচ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা এখন অকল্যাণে ব্যবহূত হচ্ছে।

ক’দিন আগে একটি জাতীয় দৈনিকের সংবাদ আমাদের নজর কাড়ে। ব্যথিত হয়েছি সংবাদ পাঠে। জানা গেছে, রাজধানীর ৭৭ শতাংশ স্কুল পড়ুয়া শিশু পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত। বেসরকারি একটা সংস্থা ৫০০ শিশুর ওপর জরিপ চালিয়ে এ তথ্য দিয়েছেন। অভিভাবকগণ যাতে একটু সতর্ক হন সেই প্রয়াস চালিয়েছেন তারা; কিন্তু সংস্থাটি শুধু রাজধানী পর্যন্তই সীমাবদ্ধ রইল কেন, তা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়! জরিপটা মফস্বল কিংবা গ্রামগঞ্জের শিশুদের ওপরও চালাতে পারতেন। কারণ আমাদের জানামতে রাজধানীর চেয়েও এ ব্যাপারে গ্রামের শিশুরা বেশি এগিয়ে। রাস্তাঘাটে কিংবা ঘরের কোনায় অথবা খোলা মাঠ-প্রান্তরে মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে এ কাজটি করে থাকে সর্বক্ষণ অনেক তরুণ-যুবক। সুযোগটা তৈরি হওয়ার প্রধান কারণ বাবা বা বড়ভাই বাড়ি নেই। তারা বিদেশ থাকেন। ছেলে অথবা ছোট ভাইয়ের জন্য একটি ট্যাব অথবা দামি ফোনসেট পাঠিয়ে দিয়েছেন যেন তার সঙ্গে ইমু বা স্কাইপির মাধ্যমে কথা বলতে পারেন। সেটি চিন্তা করেই তারা ভালো দামি সেট পাঠিয়েছেন। আর ছেলে বা ভাই উপযুক্ত কাজটি করছে দামি ফোনসেট ব্যবহার করে যা প্রবাসী মানুষটি ঘুণাক্ষরেও জানেন না। প্রশ্ন উঠতে পারে তবে কি আমরা যুগের হাওয়া গায়ে না লাগিয়ে পিছিয়ে থাকবো? আমরা ইন্টারনেট কিংবা ফেসবুক ব্যবহার করবো না? কেন নয়? ব্যবহার করবো, তবে অবশ্যই অপ্রাপ্তবয়স্ক কারো হাতে ফোনসেট দেব না। এ ক্ষেত্রে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সমাজে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। 

অন্যদিকে সেলফোন কোম্পানিকে এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। শুধু সিম নয়, অপ্রাপ্তবয়স্ক  কেউ ফোনসেট হাতে নিতে পারবে না— এমন আইন করাও জরুরি। উপর্যুপরি বিজ্ঞাপন দিয়ে কিংবা লিফলেট বিতরণ করে শিশুদেরকে সতর্ক করতে হবে। মাঝে মধ্যে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা তল্লাশি চালাতে পারেন। যেমনটি করা হচ্ছে মাদকদ্রব্য তল্লাশির ক্ষেত্রে। তাতে করে নৈতিক শৃঙ্খলা কিছুটা হলেও উন্নতি হবে বলে মনে করি। এখানে না বললেই নয়, শিশু ইন্টারনেট ব্যবহার করবে বা শিখবে তাতে আপত্তি নেই আমাদের। আপত্তি হচ্ছে ইন্টারনেটের ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিশুদের প্রতি আমাদের নজর রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই মা-বাবা এবং স্কুল শিক্ষকদের সতর্ক এবং সচেতন হতে হবে। শিশুদেরকে বেশি বেশি বই পড়তে উত্সাহিত করতে হবে। তাদের জন্য খেলাধুলার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। তাহলে হয়তো এ ব্যাধি থেকে বহুলাংশে রক্ষা পাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।

n লেখক : কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও বন্যপ্রাণী বিশারদ

alamshine@gmail.com