মনপুরার ৭০ ভাগ মানুষ মত্স্য সম্পদের উপর নির্ভরশীল। তারা মেঘনা ও বঙ্গোপসাগরে ইলিশ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে। তাদের অধিকাংশেরই নেই মাথা গুজার মত নিরাপদ আবাস।
মত্স্য সম্পদ তাদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন হলেও মাছ ধরার জন্য নগদ অর্থসহ যেসব সাজ-সরঞ্জাম লাগে তাদের অনেকেরই তা নেই। তাই ইলিশের মৌসুম এলেই জাল-দড়ি, ট্রলার, নৌকা, জ্বালানিসহ সমুদ্র যাত্রার প্রস্তুতি নিতে তাদের ছুটতে হয় মহাজন বা আড়তদারের কাছে। তাঁরা জেলেদেরকে নানা শর্তে আটকিয়ে টাকা দাদন দেয়। তাই দাদনদার কাছে জেলেরা থাকে জিম্মি।
১০/১৫ দিনের সাগর যাত্রার জন্য লাগে একটি ট্রলার, ১ জন সারেং, ১০/১৫ জন মাঝি-মাল্লা। প্রয়োজনীয় জাল, জ্বালানি, ১০/১৫ দিনের খাবার ও মত্স্য সংরক্ষণের বরফসহ প্রায় দেড় দুই লাখ টাকার বিভিন্ন সামগ্রী। মহাজন বা আড়তদারদের একতরফা শর্তে রাজি হয়ে দাদন নিয়ে জেলেরা যায় সমুদ্রে।
যারা মেঘনা নদীতে ইলিশ শিকার করে তাদের জন্য জলদস্যু ব্যতিত তেমন কোন ঝুঁকি নেই। যারা সাগরে যায় তাদের রয়েছে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ট্রলার ডুবি, জলদস্যুদের হাতে জীবন হারানোর ভয়। এছাড়াও সাগরে গিয়ে কেউ অসুস্থ্য হলে নেই চিকিত্সা নেওয়ার সুযোগ। সব মিলিয়ে সাগর যাত্রা অনেকটা শব যাত্রার মতই। তাই স্বজনদের চোখের জলে বিদায় নিয়ে আল্লার উপর ভরসা করে জেলেরা সাগরের উদ্দেশ্যে ট্রলারে উঠে।
সাগর পথে তিন দিন পাড়ি দেওয়ার পর পৌঁছায় গভীর সমুদ্রে। এরপর শুরু হয় ইলিশ শিকারের পালা। এসময় ট্রলারেই চলে রান্না-বান্না আহার ও বিশ্রাম। এরপর মাছে সংরক্ষণাগার পূর্ণ হলে শুরু হয় ফেরার পালা। চুক্তি অনুযায়ী মাছ এনে নামানো হয় আড়তদারের গদিঘরে। আড়তদার মাছ বিক্রির ১০/১৫ ভাগ টাকা কমিশন হিসেবে কেটে নেন। এরপর দাদনের টাকা কেটে অবশিষ্ট টাকা দেন জেলেদের।
জনতা বাজারে ট্রলারের সারেং আকতার, খলিল, হারুন ও নুরুল ইসলাম বলেন, প্রতি ট্রলারে ৩/৪ কাউন ইলিশ (এক কাউনে থাকে ৮০টি) থাকে। যার মূল্য প্রায় ৫/৬ লক্ষ টাকা। খরচ বাদে থাকে ৩/৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে ট্রলার ডুবি, দস্যুতার কারণে বা মাছ না পেয়ে জেলেরা খালি হাতে ফিরলে তার দায়ও উঠে জেলেদের কাঁধে।
হাজিরহাট ঘাটের আড়তদার নিজামউদ্দিন হাওলাদার ও রামনেওয়াজ ঘাটের আড়তদার মো. মোশারেফ হোসেন ইত্তেফাককে জানান, মেঘনায় ভরা মৌসুমেও মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। দাদনের টাকা কিভাবে উঠবে তা নিয়ে চিন্তায় ঘুম হয় না।
মত্স্য ঘাটে এক দেড় কেজি ওজনের ১ হালি (৪টা) ইলিশের দাম ৪ হাজার ৫ শ’ থেকে ৫ হাজার টাকা, ৮/৯ শ’ গ্রামের ইলিশের হালি ৩ হাজার ৮শত থেকে ৪ হাজার ২শত টাকা, ৫/৬ শ’ গ্রামের ১ হালির দাম ১ হাজার ৫শত থেকে ২ হাজার টাকা।
অনেক সারেংয়ের ট্রলার ও জাল-দড়ি থাকলেও সাগরে যাওয়ার জ্বালানি, খাবার, বরফসহ এক দেড় লাখ টাকার বিভিন্ন সামগ্রী সংগ্রহের ক্ষমতা নেই। অন্যদিকে যাদের শ্রম ও ঘামে ইলিশ নিয়ে বাঙালির গৌরব তাদের জন্য আজও গড়ে উঠেনি পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার মত কোন প্রতিষ্ঠান। জেলে পরিবারের নারীদের জন্য বাড়তি আয়ের কোন সংস্থান নেই। তাই এসব নারীদের জন্য সরকারি বা বেসকরকারি মালিকানায় কোন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে কর্ম পেত হাজারো নিঃস্ব নারী।
বিভিন্ন পেশার প্রসারের জন্য ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা থাকলেও মত্স্যজীবীদের সে সুবিধা নেই। তাই ইলিশের মৌসুমে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে জেলেদের জীবন সংগ্রাম অনেকটাই সহজ হতো। এব্যাপারে কোন ব্যাংক এগিয়ে এলে তারা দাদনের অভিশাপ থেকেও মুক্তি পেত।
ইত্তেফাক/এএন