‘একটি পরিবার এইখানে আশ্রয়ের জন্য আসিয়াছিল। নিরাপত্তা চাহিয়াছিল। তাহাদের নৃশংস মৃত্যু দেখিয়া কী যে যন্ত্রণা হইতেছে—তাহা বলিতে পারিব না।’ কয়েকদিন পূর্বে স্কুলশিক্ষার্থীদের মাঝে এই বার্তা ছড়াইয়া দিলেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আর্ডেন। গত ১৫ মার্চে নিউজিল্যান্ডের দুইটি মসজিদে ভয়াবহ বন্দুক হামলাকারী ব্রেন্টন ট্যারান্টের ব্যাপারে গত মঙ্গলবার তিনি বলিয়াছেন, ‘ও একজন সন্ত্রাসবাদী, অপরাধী, কট্টরপন্থি, কিন্তু ইহার পর হইতে যখন আমি কথা বলিব তখন তাহার নাম অনুচ্চারিতই থাকিবে। আর আপনাদের নিকট অনুরোধ, তাহাদের কথা বলুন যাহারা মারা গিয়াছেন, তাহার কথা নহে যে হত্যা করিয়াছে। সে হয়তো এইভাবে প্রচারের আলোয় আসিতে চাহিয়াছিল—কিন্তু নিউজিল্যান্ড তাহাকে ভুলিয়া যাইতে চাহে।’
দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ নিউজিল্যান্ডে প্রায় ৪৫ হাজার মুসলমান বসবাস করেন। মোট জনসংখ্যার মাত্র এক-শতাংশ মুসলিম। তবে ৯/১১ পরবর্তী সময়ে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মুসলমানদের সন্দেহের চোখে দেখিতে শুরু করেন অনেক অমুসলিম জনগণ। প্রায় এক দশক আগে ওয়েকাতো মুসলিম অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ইসমাইল গামাদিদ জানাইয়াছিলেন যে, ‘নিউজিল্যান্ডের অনেক অমুসলিমের ধারণা, মসজিদে বোমা তৈরি করা হয়।’ কিছুদিন পূর্বে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলি হইতে মুসলিম অভিবাসী গ্রহণের বাত্সরিক কোটা বৃদ্ধি করিয়াছে নিউজিল্যান্ড। ইহাকে ভালো চোখে দেখিতেছে না অনেক শ্বেতাঙ্গ নাগরিক। আমরা দেখিয়াছি, ক্রাইস্টচার্চ শহরের দুইটি মসজিদে গুলি চালাইয়া ৫০ জনকে হত্যা করিবার লাইভ ভিডিও ছড়াইয়া দিয়াছিল খুনি ব্রেন্টন ট্যারান্ট। সেই বিদ্বেষপূর্ণ নৃশংস ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ বিদ্বেষ মনোভাবাপন্ন মানুষও তাহাদের টাইমলাইনে ছড়াইয়া দিয়াছিল। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ প্রায় পনেরো লক্ষ ভিডিও অপসারণ করিয়াছে। কিন্তু বিদ্বেষের এই দাবানলের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান লইয়া যেই বার্তা প্রতিনিয়ত প্রদান করিতেছেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী তাহা নিঃসন্দেহে খুবই তাত্পর্যপূর্ণ। আমরা অপার মুগ্ধতার সঙ্গে লক্ষ্য করিয়াছি, ১৫ মার্চের অতি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের পর গত শুক্রবারের শোক সমাবেশে তিনি মুসলিমদের উদ্দেশে বলিয়াছেন, ‘নিউজিল্যান্ড আপনাদের সঙ্গে শোকাহত, আমরা অভিন্ন।’ ইহার আগে গত মঙ্গলবার পার্লামেন্টের অধিবেশনে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা বক্তৃতা শুরুই করিয়াছেন—‘ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রাহামাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতু’—যাহার অর্থ শান্তি, ক্ষমা ও ঈশ্বরের আশীর্বাদ সকলের সঙ্গে থাকুক। তিনি হইয়া উঠিয়াছেন নিউজিল্যান্ডবাসী একতার প্রতীক, মানবিকতার মানসমূর্তি। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী কখনো ‘হিজাব’ পরিয়া, কখনো আর্দ্র বেদনার্ত অবয়বে যেইভাবে দেশটির মুসলিম সমপ্রদায়ের পাশে দাঁড়াইয়াছেন, যেইভাবে ইস্পাতদৃঢ় ভূমিকা পালন করিয়াছেন, তাহা এই বিশ্বে মানবিক জগতে নূতন অক্সিজেনের জোগান দিতেছে নিঃসন্দেহে। আর্ডেনের মতোই ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে সরব হইয়াছেন ব্রিটেনের জেরেমি করবিন, আমেরিকার বার্নি স্যান্ডার্স এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো।
ঘৃণার মাধ্যমে যেমন নূতন নূতন ঘৃণা ছড়াইয়া পড়ে, তেমনি করিয়া ভালোবাসা এবং মানবিকতাও বিস্তৃত করে নূতন নূতন মানবিকতার ক্ষেত্র। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর ভালোবাসার এই আলো ছড়াইয়া পড়ুক বিশ্বময়।