ডিশওয়াশার থেকে রেস্তোরার মালিক মনিরুল

রান্নাঘরে উনার প্রবেশ ডিশওয়াশার হিসেবে, দীর্ঘপথ পেরিয়ে তিনি এখন নামকরা শেফ। কথা হচ্ছিল বন্দর নগরী চট্টগ্রামের নামকরা লেমনগ্রাস রেস্টুরেন্টের মালিক মো. মনিরুল ইসলামের সঙ্গে।
 
মাত্র ১৬ মাসের মধ্যে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠা চাইনিজ, থাই ও কন্টিনেন্টাল খাবারের জনপ্রিয় এই রেস্টুরেন্টটি ছাড়াও তার রয়েছে পাঁচফোড়ন নামের বাংলা খাবারের আরো একটি রেস্টুরেন্ট। পরিকল্পনায় আছে ১২ হাজার স্কয়ার ফিটের একটি নতুন রেস্তোরার। ইত্তেফাক অনলাইনের সঙ্গে কথপোকথনে জানিয়েছেন তার বিস্ময়কর উত্থানের গল্প।
 
মনিরুল ইসলামের গল্পের শুরু অস্ট্রেলিয়ায় প্রফেশনাল অ্যাকাউন্টিং নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে। সেখানে নিজের চলার খরচ মেটাতে বিভিন্ন ধরনের ‘অড জব’ করতে করতে এক সময় একটি রেস্টুরেন্টে কিচেন হেলপার হিসেবে যোগ দেন, যেখানে তার ভূমিকা ছিল ডিশ ওয়াশার। সেসব দিনের কথা স্মরণ করে মনিরুল বলেন, আমাকে এত ডিশ পরিষ্কার করতে হত যে আমার সামনে রীতিমতো পাহাড় জমে যেত!
 
সেই রেস্টুরেন্টেই তার ‘শেফগিরি’-র শুরু। মনিরুল বলেন, রেস্টুরেন্টে অন্য শেফদের অনুপস্থিতিতে আমাকে ওভেনের দায়িত্ব পালন করতে হত। আম্মার সঙ্গে রান্নার অভিজ্ঞতা আগেই ছিল। সেটাই কাজে লেগে যায়। 
 
IMG0
 
ইতোমধ্যেই তিনি বুঝতে পারেন, তার আসল জায়গা হচ্ছে ‘কিচেন’ তথা রান্নাঘর। শুরু করেন সেই উদ্দেশ্যে পড়াশোনা। সিডনির কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হোটেল ম্যানেজমেন্ট কোর্স করেন। ২০০৮ সালে নিউ সাউথ ওয়েলসের টেফ ইন্সটিটিউট এর সম্মানজনক শেফ সার্টিফিকেট অর্জন করেন। সেখানের সার্টিফিকেট পাওয়ার গল্পটাও মজার। মনিরুল বলেন, সার্টিফিকেটের জন্য আট ঘণ্টার একটি পরীক্ষা দিতে হয় যেখানে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দুই অংশই রয়েছে। প্রথমবারে আমি আট ঘণ্টার পরীক্ষায় সফলভাবে উতরে গেলেও একটি কারণে আমাকে সার্টিফিকেট দেয়া হয়নি। কারণ জানতে চাইলে কর্তৃপক্ষ বলে আমি সবকিছুতে ভালো করলেও পরিচ্ছন্নতা পরীক্ষায় উতরাইনি, রান্নাঘরে প্রবেশ করার সময়ে ক্যামেরায় দেখা গেছে যে আমি হাত ধুয়ে প্রবেশ করিনি। অথচ আমি ঢোকার আগেই বেসিনে হাত ধুয়েছিলাম যা ক্যামেরার আওতার বাইরে ছিল। কিন্তু সেটা তারা মানতে রাজি হয়নি। পরে আমাকে পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক আরেকটি কোর্স করে সার্টিফিকেট নিতে হয়।
 
সেই সার্টিফিকেট পেয়ে তার জীবনে আমূল পরিবর্তন আসে। ডেভিড জোন্স নামের ১০ হাজার বর্গফুটের রেস্টুরেন্টের কারি তৈরির দায়িত্ব পান। সেখানে তার অধীনে ১২ জন কাজ করতেন। সেখানে জার্মান, ইতালিয়ানসহ বিভিন্ন দেশের জাতিসত্ত্বার রান্নার বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেন।
 
২০১২ সালে দেশে ফিরে আসেন, থিতু হন নিজের জন্মস্থান চট্টগ্রামে। বিভিন্ন ব্যবসার চেষ্টা করে ২০১৪ সালের শেষের দিকে শুরু করেন নিজের হোটেল ‘লেমনগ্রাস’। দুই শতাধিক মেন্যুর এই রেস্টুরেন্টটি ইতোমধ্যেই খাদ্যপ্রেমীদের মনে বিশেষ জায়গা করে নিচ্ছে। নিয়মিত মেন্যুর পাশাপাশি নিজের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ব্যবহার করে খাদ্যপ্রেমীদের নিত্যনতুন চমক উপহার দিচ্ছেন মনিরুল ইসলাম। যেমন গত ২৮ আগস্ট তার ফেসবুক পেজ থেকে পোস্ট করা হয় নতুন আবিষ্কার ‘ফুচকি’-র কথা। পোস্টে বলা হয়, ফুচকি লেমনগ্রাসের বৈপ্লবিক আবিষ্কার। ইনশাল্লাহ এটা শুধু বাংলাদেশেই জনপ্রিয় হবে না সারা বিশ্ব এটি অনুসরণ করবে। বি.দ্র: দয়া করে ফুচকার সঙ্গে এর তুলনা করবেন না, দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন খাবার।
 
IMG1
 
এছাড়াও তার রয়েছে এমন অসংখ্য আবিষ্কার। থাই, চাইনিজ ও কন্টিনেন্টাল খাবারের এই রেস্তোরার পাশাপাশি তার রয়েছে সম্পূর্ণ বাংলা খাবারের জন্য ‘পাঁচফোড়ন’ রেস্তোরা। ডিশওয়াশার হিসেবে রেস্তোরায় কাজ শুরু করা মনিরুলের রেস্তোরার কিচেনে ২৭ জন স্টাফ কাজ করে। বিশিষ্ট রন্ধনশিল্পী দিলরুবা বেগম ফ্যান্সি বলেন, মনিরুল রান্নার ব্যাকরণ জানেন। খাদ্য নিয়ে তার উদ্ভাবনী ভাবনা রীতিমতো বিস্ময়কর।
 
নিজের সাফল্যের পেছনের কারণগুলো বলতে গিয়ে বলেন, সফল শেফ হতে হলে আপনাকে সৃজনশীল, ভারসাম্যপূর্ণ, সময়ানুবর্তী ও সত্ হতে হবে। আপনি যদি সততা ও একাগ্রতার সঙ্গে কোনো কাজ করেন তাহলে সেখানে অবশ্যই সফলতা আসবে।
 
ক্যারিয়ার হিসেবে শেফ কেমন সেটা জানতে চাইলে বলেন, আমাদের দেশে এখনো এই পেশাটিকে খুব ভালো চোখে দেখা হয় না। কিন্তু আয়ের ক্ষেত্রে পুরো বিশ্বে এটি পঞ্চম স্থানে রয়েছে। এই পেশায় উপভোগ করার অনেক কিছু আছে, নতুন সংস্কৃতি ও নতুন মানুষদের সঙ্গে জানা বোঝার সুযোগ রয়েছে। বিভিন্ন টেলিভিশনে রান্নার অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া মনিরুল ১২ হাজার বর্গফুটের নতুন একটি রেস্তোরা খুলছেন। তার ইচ্ছা নিজের একাগ্র অধ্যয়ন ও অভিজ্ঞতায় অর্জিত শিক্ষা আগ্রহী তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া।
 
ইত্তেফাক/এসএসএ