শামীম হামিদ, চট্টগ্রাম অফিস
১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে সম্পাদিত পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্রের মজুদ বেড়েছে কমপক্ষে তিনগুণ। একটি গোয়েন্দা সংস্থা হতে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পূর্ববর্তী দুই দশকে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল ১ হাজার ৬০০ অস্ত্র ও সাড়ে ৫ লাখ গোলাবারুদ। অথচ শান্তি চুক্তির পরে এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১ বছরে উদ্ধার হয়েছে সাড়ে চার হাজারের মত অত্যাধুনিক অস্ত্র ও আড়াই লক্ষ গোলাবারুদ। চুক্তি পরবর্তী সময়ে পাহাড় থেকে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের সংখ্যা দেখেই অনুমান করা যায় বর্তমানে পার্বত্য সশস্ত্র গ্রুপগুলোর হাতে কী পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠনগুলো শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে কতটা আন্তরিক সেটা সম্পর্কেও এই তথ্য থেকে ধারণা পাওয়া যায়। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, চুক্তি পরবর্তী দুই যুগে উদ্ধারকৃত অস্ত্রগুলোর মধ্যে শুধু অত্যাধুনিক অস্ত্রগুলোই হিসাবে আনা হয়েছে। দেশি গাদা বন্দুক, কাটা রাইফেল জাতীয় অস্ত্র হিসাবে ধরা হয়নি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে আনুষ্ঠানিকভাবে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে গেরিলা নেতা সন্তু লারমার নেতৃত্বে অস্ত্র সমর্পণ করে জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র শাখা শান্তি বাহিনীর সদস্যরা। গোয়েন্দা সংস্থা হতে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, শান্তি বাহিনীর অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণের দৃশ্যটি ছিল মূলত লোক দেখানো। তারা ওইদিন মাত্র ১০ শতাংশ অস্ত্র জমা দিয়েছিল যার অধিকাংশই ছিল জরাজীর্ণ ও ভাঙাচোরা। বাকি ৯০ শতাংশ অস্ত্রই তারা নিজেদের গোপন আস্তানায় মজুদ করে রেখেছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে তারা ওইসব অস্ত্র পাহাড়ে আধিপত্য বিস্তারের কাজে ব্যবহার করেছে।
পুনরায় অস্ত্রের ব্যবহার শুরুর জন্য নিজেদের মত করে একটি যুক্তি দেখায় জেএসএস (সন্তু গ্রুপ)। তারা ইউপিডিএফকে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের প্রধান অন্তরায় বলে দাবি করে। আর তাদেরকে নির্মূল করার জন্যই অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে বলে যুক্তি দেখায়। সরকারের সঙ্গে পার্বত্য শান্তি চুক্তিতে জনসংহতি সমিতির পক্ষে সই করেছিলেন দলের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা। চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ার জন্য বরাবরই তিনি সরকারকে দায়ী করে আসছেন। অথচ গত দুই দশক ধরে নিজের নানা কর্মকাণ্ডের কারণে চুক্তির প্রতি সন্তু লারমার আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সন্তু লারমার কারণেই পাহাড়ের একটি আঞ্চলিক সংগঠন ভেঙে বর্তমানে চারটি সংগঠন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বছর কয়েক আগে একটি টিভি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে সন্তু লারমা বলেছিলেন, চুক্তি বাস্তবায়নের পথে প্রধান বাধা ইউপিডিএফ। অথচ সরকার ইউপিডিএফকে সমর্থন করে যাচ্ছে। এ কারণে ইউপিডিএফকে নির্মূল করতে ২০০০ সাল থেকে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে জন সংহতি সমিতি। সাক্ষাত্কারে সন্তু লারমা দ্বিধাহীনভাবেই বলেন যে, শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের অন্তরায় দূর করতে তারা পুনরায় অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছেন। তার দলের কয়েক শত সদস্যের কাছে অস্ত্র রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, বিষয়টি কখনো স্বীকার না করলেও ২০০০ সাল থেকে তারা (জেএসএস) সীমিত আকারে অস্ত্রের ব্যবহার শুরু করেন। ইউপিডিএফ ও যারা তাদের সঙ্গে যুক্ত আছে তাদের সঙ্গে সংঘাতটা চলছে বলে জানান তিনি।
অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার কারণ হিসেবে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়াকে চিহ্নিত করলেও সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায় সরকারের আন্তরিকতা ও অব্যাহত প্রচেষ্টার কারণে শান্তিচুক্তির পর হতে এ পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে, উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, চুক্তির অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়েছে। এ পর্যন্ত চুক্তির মোট ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টির পূর্ণ বাস্তবায়ন, ১৫টির আংশিক বাস্তবায়ন এবং ৯টি ধারার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তিন পার্বত্য জেলায় হস্তান্তরযোগ্য ৩৩টি বিষয়/বিভাগের মধ্যে এ পর্যন্ত রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদে ৩০টি, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদে ৩০টি এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদে ২৮টি বিষয়/দফতর হস্তান্তর করা হয়েছে।
অপরদিকে শান্তিচুক্তি সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত না হওয়ার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম কারণ হলো শান্তিচুক্তির বেশ কিছু ধারা বাংলাদেশ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আদালতে শান্তিচুক্তির বেশ কিছু ধারা চ্যালেঞ্জ করে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তবে চুক্তির যে ধারাগুলো বাস্তবায়িত হয়নি সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। অথচ চুক্তি বাস্তবায়ন না করা নিয়ে উপজাতি বিভিন্ন সংগঠন সরকারকে দোষারোপ করে দেশে-বিদেশে নানা ধরনের নেতিবাচক কর্মসূচি পালন করে আসছে। চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিকতা দেখালেও উপজাতীয় সংগঠনগুলো চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে ততটা তত্পর নয়। উল্টো তারা পাহাড়ে স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানানো শুরু করেছে। এ নিয়ে তারা নানারকম অপতত্পরতা চালাচ্ছে। বিশেষ করে পাহাড়ে বসবাসকারী বাঙালি ও সাধারণ উপজাতিদের কাছ থেকে আদায় করছে বিপুল অঙ্কের চাঁদা। তা দিয়ে তারা তাদের সশস্ত্র গ্রুপকে শক্তিশালী করছে। গোপনে বিদেশ থেকে কেনা হচ্ছে ভারী, দামি ও অত্যাধুনিক অস্ত্র। তিন পার্বত্য জেলাকে অস্ত্রের রুট হিসেবে ব্যবহার করছে সশস্ত্র গ্রুপের সদস্যরা। এতে নিজেদের অস্ত্রের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি দেশে জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িতদের কাছে বিক্রি করছে ভারী ও অত্যাধুনিক অস্ত্র।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউপিডিএফ নেতা ইত্তেফাককে বলেন, পার্বত্য এলাকা গত চার দশকের বেশি সময় ধরে অস্থিতিশীল করে রেখেছে সন্তু লারমার সংগঠন জনসংহতি সমিতি। সন্তু লারমা দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান। এটি একটি নির্বাচিত পরিষদ হলেও সন্তু লারমা তার একক আধিপত্য বজায় রাখার জন্য নির্বাচন করতে দিচ্ছেন না। তার স্বৈরাচারী দৃষ্টিভঙ্গি আঞ্চলিক সংগঠনগুলোকে বিভক্তির দিকে ঠেলে দিয়েছে।