প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেছেন, তফসিল ঘোষণার পর কাউকে বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার করবেন না। মামলা করবেন না। কাউকে হয়রানিমূলক মামলা বা গ্রেফতার করা যাবে না। আশা করি আপনারা এটা করছেনও না। একইসঙ্গে তিনি বলেন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের তথ্য সংগ্রহ করার কথা আমরা বলিনি। এটা আপনারা করবেন না। কারণ এটা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠে। যারা ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা তারা বিব্রত হন। আমরা এটা চাই না।
গতকাল বৃহস্পতিবার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ক বিশেষ সভায় সভাপতির বক্তব্যে সিইসি এসব কথা বলেন। ১৫ ডিসেম্বরের পর সশস্ত্র বাহিনীর ছোট টিম পুলিশের সাথে দেখা করবে। প্রতি জেলায় সশস্ত্র বাহিনীর ছোট টিম থাকবে বলে পুলিশকে অবগত করেন সিইসি। সেখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ১২ দফা নির্দেশনা দেন তিনি। সভায় চার নির্বাচন কমিশনার, আইজিপি, জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব, ডিএমপি কমিশনার, এনআইডি উইংয়ের ডিজি, ইসির অতিরিক্ত সচিব, বিভিন্ন রেঞ্জের উপ-মহা পুলিশ পরিদর্শক, মেট্রোপলিটনের কমিশনারসহ ও বিভিন্ন জেলার পুলিশ সুপারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন না করলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। একাধিক পুলিশ সুপার ভোটের আগে তাদের বদলি বা প্রত্যাহারের আশঙ্কা ব্যক্ত করেন। এ নিয়ে তাদের কেউ কেউ উদ্বেগও প্রকাশ করেন বৈঠকে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় একটি জেলার পুলিশ সুপার বলেন, কোন পক্ষের ঢালাও অভিযোগে ব্যবস্থা নেয়া ঠিক হবে না। একইভাবে সিলেট বিভাগের একজন পুলিশ কর্মকর্তাও তাকে প্রত্যাহারের আশঙ্কা ব্যক্ত করেন। উত্তরাঞ্চলের একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ২০১৪ সালে তার এলাকায় ৪৫টি ভোট কেন্দ্র পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। সেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞতা তাদের রয়েছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) পুলিশ সুপারের কমান্ডের আওতায় আনারও প্রস্তাব দেন ওই কর্মকর্তা। বরিশাল অঞ্চলের এক কর্মকর্তা বলেন, তার এলাকার বেশিরভাগ কেন্দ্র প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত। তাই প্রিজাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তাদের বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মানসিক ও শারীরিকভাবে শক্ত সামর্থ্য হওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া উচিত। ঢাকার জেলার একজন কর্মকর্তা গণমাধ্যম কর্মীদের তত্ত্বাবধানের বিষয়ে কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, অনেকগুলো ক্যামেরা একই সঙ্গে একটি ভোট কক্ষে প্রবেশ করলে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। একসঙ্গে কয়জন ঢুকবেন এবং কতক্ষণ অবস্থান করবেন এ ব্যাপারে নির্দেশনা থাকা উচিত। ঢাকা মহানগর পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বৈঠকে বলেন, গায়েবি মামলা বলতে কোন বিষয় নেই।
এই বৈঠকে কমিশনের অন্য চার সদস্যের মধ্যে তিনজন পুলিশকে আশ্বস্ত করে বক্তব্য দেন। তবে কমিশনার মাহবুব তালুকদার পুলিশের বিরুদ্ধে বেশকিছু অভিযোগ তুলে ধরেন। কমিশনার হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, রংপুর ও কুমিল্লা সিটি সুনামের সঙ্গে পার করলেও খুলনা, গাজীপুর, রাজশাহী, সিলেট ও বরিশালের অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন।
গাজীপুর ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের ভোটে নিজের সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করে মাহবুব তালুকদার বলেন, গাজীপুর সিটি নিয়ে তিনি একটি তদন্ত প্রতিবেদন সিইসির কাছে জমা দিলেও অজ্ঞাত কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি। এ দুটি নির্বাচনে শান্তি বজায় থাকলেও শৃঙ্খলা ছিল না। গাজীপুরে প্রিজাইডিং কর্মকর্তা নিয়োগে স্থানীয় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে তালিকা পাঠানো হলেও তাতে কারো সই ছিল না। রিটার্নিং কর্মকর্তাকে এভাবে অযাচিত সহায়তার কোনো প্রয়োজন আছে কি?
পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে লিখিত বক্তব্যে মাহবুব তালুকদার বলেন, ‘বর্তমানে বহুল প্রচলিত গায়েবি মামলা এখন আর গায়েবি আওয়াজ নয়। মাননীয় হাইকোর্ট পর্যন্ত এ ধরনের মামলাতে পুলিশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হয় বলে উল্লেখ করেছেন। ঢাকার পুলিশ কমিশনার মহোদয় পুলিশ বাহিনীকে গায়েবি মামলা না করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তারপরও অনেক ক্ষেত্রে এরূপ মামলা চালু রয়েছে।
নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে বদ্ধপরিকর ইসি : সচিব
নির্বাচন কমিশন (ইসি) দেশবাসীকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য বদ্ধপরিকর বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ। তিনি বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ। দেশবাসীকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য বদ্ধপরিকর বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। আর সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে পুলিশ অন্যতম একটি সংস্থা। আমরা আশা করি, তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
পুলিশকে সিইসির ১২ নির্দেশনা
পুলিশকে ১২ দফা নির্দেশনা দিয়ে সিইসি বলেন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের তথ্য সংগ্রহ করার কথা আমরা বলিনি। এটা আপনারা করবেন না। কারণ এটা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠে। যারা ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা তারা বিব্রত হন। যদি তথ্য সংগ্রহ করার প্রয়োজন হয় তাহলে কোনো ব্যক্তির তথ্য গোপন সূত্র ব্যবহার করে সংগ্রহ করতে পারেন। বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস করার দরকার নেই। এটা আমরা চাই না।
সিইসি আরো বলেন, নির্বাচন যেন কোনোভাবে প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব পালনে আমরা পূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। তবে কমিশন আপনাদের কর্মকাণ্ড নজরদারি করবে। অলরেডি অভিযোগ আসা শুরু করেছে। তবে, নির্বিঘ্নে দায়িত্ব পালন করবেন। ভালোভাবে যাচাই না করে আপনাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। এতে আপনাদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আইনশৃঙ্খলার বিভিন্ন পর্যায়ের তথ্য একমাত্র পুলিশেরই আছে। তাই বিভিন্ন বাহিনী পুলিশের কাছ থেকেই পরামর্শ নিবে। পুলিশকে এখনই কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে বলেও জানান সিইসি।
তিনি আরো বলেন, এদিকে ১৫ ডিসেম্বরের পর সশস্ত্র বাহিনীর ছোট টিম পুলিশের সঙ্গে দেখা করবে। প্রতি জেলায় থাকবে সশস্ত্র বাহিনীর ছোট টিম। এদেরকে নিয়ে সমন্বয় করে কাজ করবেন। তাদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করে রাখতে হবে। অন্যান্য বাহিনী ও ম্যাজিস্ট্রেটকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করবেন।
প্রসঙ্গত, ৩০ ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচনের ভোট। এ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ২৮ নভেম্বর, মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের দিন ২ ডিসেম্বর এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ৯ ডিসেম্বর।