গরিব উপেনের দুই বিঘা জমির উপর শ্যেনদৃষ্টি পড়িয়াছিল মহারাজের। তাহার নূতন বাগানটি আরো সুন্দর করিয়া সাজাইতে চাহেন উপেনের শেষসম্বল জমিটুকু দিয়া। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাহার ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতায় আঁকিয়াছেন পরাশক্তিধরদের লোভের এমন মানসভূমি। লেভ তলস্তয় তাহার ‘সাড়ে তিন হাত জমি’ গল্পে দেখাইয়াছেন, আদিগন্ত বিপুল ভূমি ক্রয় করিতে গিয়া পাখোম কীভাবে মারা গেল জমি দখলের অন্তিম মুহূর্তে। শেষাবধি কবরের জন্য তাহার প্রয়োজন হইল মাত্র সাড়ে তিন হাত জমি।
এইসকল কথা এখন অবশ্য চর্বিতচর্বণ। পরাশক্তিদের নিকট ইহার কোনো মূল্য নাই। পরাশক্তিধররা যেন একটি রোবোটিক সিস্টেমের মধ্যে পরিচালিত হন। তাহাদের কোনো মানবিক বোধ নাই, সহমর্মিতা নাই, সমব্যথিতা নাই। তাহারা কেবল আগ্রাসন বোঝেন, লাভ আর লোভের বেসাতিতে ডুবিয়া থাকেন। অথচ মানবসভ্যতা বিকাশের নেপথ্যে ছিল জীবনকে সহজ-সুন্দর-স্বস্তিময় ও নির্মল করা। একবিংশ শতাব্দীতে আসিয়া বিজ্ঞান-প্রযুক্তির কল্যাণে বিশ্বব্যাপী উত্পাদন বাড়িতেছে, সম্পদ বাড়িতেছে, মাথাপিছু গড় আয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়িতেছে। সকল দেশেই কমবেশি বাড়িতেছে প্রাচুর্য ও ভোগবিলাস। কিন্তু এত প্রাচুর্যময় পৃথিবীতেও মানুষের মনে স্বস্তি নাই, শান্তি নাই, মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস লইবার ফুরসত নাই। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের সর্বশেষ গবেষণা অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ২০টি রাষ্ট্রে সংঘর্ষ বা যুদ্ধ পরিস্থিতি বিদ্যমান রহিয়াছে। ইহার মধ্যে ১৬টি রাষ্ট্র সংকটময় অবস্থায়। আমরা দেখিয়াছি, ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর নূতন নূতন অজুহাতে যুদ্ধ-মৃত্যু আর আগ্রাসন বিস্তৃত হইয়াছে বিশ্বজুড়িয়া। দেশে দেশে নিভৃতে ছড়াইয়া পড়িতেছে এক হিমশীতল ‘ভয়ের সংস্কৃতি’।
ইহা ঠিক যে, বিশ্ব ইতিহাস কখনই একই ছন্দে চলে নাই। পরাশক্তির দ্বন্দ্বের বিস্তার ঘটিয়াছে নূতন নূতন জনপদের উপর প্রভাব সৃষ্টি করিয়া। বিশ্বের বর্তমান এই টান টান উত্তেজনার নেপথ্যেও রহিয়াছে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব-সংঘাত। অথচ স্বস্তিদায়ক বিশ্বের স্বার্থে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গঠন করা হইয়াছিল জাতিসংঘ। কথা ছিল সেইখানে উন্নত-অনুন্নত, ধনী-গরিব—সকল রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরাই নিজেদের কথা বলিতে পারিবে। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদ গঠন করিয়া নষ্ট করা হইয়াছে জাতিসংঘের মূলশক্তিকে। যাহার ফলে পরাশক্তিসম্পন্ন রাষ্ট্রসমূহ জাতিসংঘকে পাশ কাটাইয়া নিজেদের মনপছন্দ সিদ্ধান্ত লইতে দ্বিধা করে না। পরাশক্তিধরদের ইচ্ছাতেই চলে নূতন ভাঙাগড়া। এই ভাঙাগড়ায় কত জনপদ ধ্বংস হইল, কত মানুষ প্রাণ হারাইল, কত মানুষ ছিটকাইয়া পড়িল তাহার উন্নত জীবন হইতে, গায়ে গাঁথিল শরণার্থীর তকমা—পরাশক্তিদের তাহাতে কিছুই আসে যায় না।
পরাশক্তিধররা যেন দানব হইয়া উঠিয়াছে। তাহাদের মনে রাখা উচিত—মানবের তরে মাটির পৃথিবী, দানবের তরে নয়। তাহারা অন্যের ঘরে নাক না গলাইয়া নিজেদের ঘরে মনোনিবেশ করুন, নিজেরা শান্তিতে থাকুন, অন্যদেরও স্বস্তিতে থাকিতে দিন। নচেত্ দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়া যাওয়া বিপন্ন মানুষেরা রুখিয়া দাঁড়াইবেই, বাহির করিবেই নূতন পথ।