কয়েক নেতার খেলায় হেরে গেলেন কাদের

ছোট ভাই জি এম কাদেরকে জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ শুক্রবার প্রায় গভীর রাতে দলের কো-চেয়ারম্যান পদ থেকে বাদ দেওয়ার পরদিনই সংসদে বিরোধী দলীয় উপনেতার পদ থেকেও অপসারণ করায় দলটির ভেতরে-বাইরে নানামুখী কথাবার্তা চলছে। এরশাদের শারীরিক অবস্থা নিয়ে যখন দলের নেতা-কর্মীরা উত্কণ্ঠিত, তখন অনেকটা আকস্মিক এই সিদ্ধান্তে নড়েচড়ে উঠেছেন নেতা-কর্মীরা। রাজধানীর বনানীতে জাপা চেয়ারম্যানের কার্যালয় ও কাকরাইলে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ নেতাদের ব্যক্তিগত অফিস-বাসায় আলোচনায় ঘুরেফিরে যে বিষয়টি উঠে আসছে সেটি হলো, সাংগঠনিক অদক্ষতা এবং জ্যেষ্ঠ নেতাদের ডিঙ্গিয়ে শুধু এরশাদের ভাই হওয়ার সুবাদে দলে-সংসদে শীর্ষপদে আসীন হওয়ার কারণেই স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ছিটকে পড়তে হয়েছে জি এম কাদেরকে।

কো-চেয়ারম্যান পদ থেকে জি এম কাদেরকে অব্যাহতি দেওয়ার চিঠিতে এরশাদ নিজেই উল্লেখ করেছেন, ‘গোলাম মোহাম্মদ কাদের পার্টি পরিচালনা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন, পার্টির সাংগঠনিক কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়েছে এবং তিনি পার্টির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছেন। পার্টির সিনিয়র নেতৃবৃন্দও তার নেতৃত্বে সংগঠন করতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।’

বড় ভাই ও দলের চেয়ারম্যানের লিখিত এই অভিযোগের বিষয়ে জি এম কাদের গতকাল রবিবার ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘ইতিপূর্বে দেওয়া চিঠিতে এরশাদ সাহেব লিখেছিলেন-                 তিনি বিদেশে থাকলে আমি সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করব। কিন্তু তিনি আমাকে আসলে কোনো দায়িত্ব দেননি। এরশাদ সাহেব দলের চেয়ারম্যান, সকল ক্ষমতা তার হাতেই। আর সাংগঠনিক বিষয় দেখার দায়িত্ব দলের মহাসচিবের। কো-চেয়ারম্যানের কি দায়িত্ব সেটাও তিনি বলেননি। কাজেই আমার ব্যর্থ হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আমি কোথায় ব্যর্থ হয়েছি সেরকম কোনো উদাহরণও তিনি দেখাতে পারেননি। আর দলে যদি কোনো বিভেদ হয়ে থাকে সেটা এরশাদ সাহেবের কারণেই হয়েছে।

পার্টির সিনিয়র নেতারা আপনার নেতৃত্বে সংগঠন করতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন- এরশাদের এই অভিযোগের জবাবে জি এম কাদের বলেন, আমাকে কো-চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধী দলীয় উপনেতা করার পরে কয়েকজন নেতা অসহযোগিতা করেছেন। কিন্তু আমার হাতে কোনো ক্ষমতা না থাকায় আমি তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারিনি। ওই চার-পাঁচজনের বিষয়ে আমি এরশাদ সাহেবকে বলেছিলামও, কিন্তু তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি।’

জাপার দায়িত্বশীল একাধিক নেতা ইত্তেফাককে জানান, একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে এরশাদ অসুস্থ হয়ে পড়ার পর দলের কো-চেয়ারম্যান হিসেবে জি এম কাদের দলের বিভিন্ন সাংগঠনিক কার্যক্রমে জ্যেষ্ঠ নেতাদের সম্পৃক্ত করতে পারেননি। শুধু জ্যেষ্ঠ নেতাদেরই নন, কেন্দ্রীয় ও মাঠ নেতাদেরও সমন্বয় করতে পারেননি তিনি।

জাপা নেতাদের অভিযোগ, একাদশ সংসদ নির্বাচনেও দলীয় প্রার্থীদের কোনো খোঁজ নেননি জি এম কাদের। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কাছ থেকে প্রত্যাশিত আসন আদায় করার ক্ষেত্রেও তিনি কোনো ভূমিকা রাখেননি। এমনকি এরশাদ যখন অসুস্থ হয়ে সিঙ্গাপুরে যান, তখনও জি এম কাদের তার যথাযথ খোঁজ নেননি। একদিনের জন্য সিঙ্গাপুর গিয়ে দেশে ফিরে আসেন কাদের।

জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সংসদ সদস্য মুজিবুল হক চুন্নু গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘উপনেতা হিসেবে জি এম কাদের একটা দিনও দলের এমপিদের নিয়ে মিটিং করেননি। আমরা সংসদে কি কি বিষয়ে কথা বলব, কে কোনটা বলবেন- এনিয়ে উনি কাউকে নির্দেশনাও দেননি, এনিয়ে তার কোনো পরিকল্পনাও দেখিনি। চুন্নু বলেন, ‘কাদের সাহেব এমনিতে ভদ্রলোক, কিন্তু দলের সবার মধ্যে সমন্বয় করে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করার মতো দক্ষতার অভাব রয়েছে তার।’