ব্রিটেনের ইতিহাসে সম্ভবত সর্ববৃহত্ সমাবেশটি অনুষ্ঠিত হইয়াছে শনিবার। সংবাদ মাধ্যমগুলির মতে ব্রেক্সিটের বিরোধিতা করিয়া এইদিন কমপক্ষে এক মিলিয়ন মানুষ সেন্ট্রাল লন্ডনের রাস্তায় নামিয়া আসিয়াছে। সারা দেশ হইতে আগত ব্রেক্সিট-বিরোধীদের ব্যাপক উপস্থিতির কারণে এক পর্যায়ে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক বন্ধ হইয়া যায় এবং কয়েক কদম অগ্রসর হওয়াও দুঃসাধ্য হইয়া পড়ে। দিন তিনেক পূর্বে প্রদত্ত এক ভাষণে ব্রিটিশ জনগণ ব্রেক্সিটের পক্ষে আছে বলিয়া প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে যেই দাবি করিয়াছিলেন, শনিবারের সমাবেশটিকে তাহার সদম্ভ প্রত্যাখ্যান হিসাবেই বিবেচনা করা হইতেছে।
শনিবারের সমাবেশে কাহারা অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা বৃথা হইবে। কেননা এই সমাবেশে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী যেমন আসিয়াছেন, তেমনি বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা-কর্মীরাও আসিয়াছেন। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) অন্যান্য দেশে বাসকারী অনেক ব্রিটিশ নাগরিকও এই সমাবেশে যোগ দিয়াছেন, ব্রেক্সিট হইয়া গেলে ইইউ দেশগুলিতে তাহারা আদৌ থাকিতে পারিবেন কিনা সেই আশঙ্কাতাড়িত হইয়াই এই মানুষেরা লন্ডনের সমাবেশে যোগ দিতে চলিয়া আসিয়াছেন। ব্রিটেনে বাসকারী ইইউ-এর অন্যান্য দেশের লোকজনও একই আশঙ্কায় ভুগিয়া সমাবেশে আসিয়াছেন। কনজারভেটিভ পার্টির অনেক নেতাই সমাবেশস্থল হইতে থেরেসা মে-এর ব্রেক্সিট নীতির তীব্র সমালোচনা করিয়াছেন। এক্ষণে কনজারভেটিভ পার্টির মধ্যে দুইটি ধারা প্রবলভাবে কাজ করিতেছে। একদল এমপি থেরেসা মে’কে সরাইয়া ইইউ-এর সহিত সৃষ্ট ব্যাপক দূরত্ব যতদূর সম্ভব মেরামতের পক্ষে। কিন্তু অন্য একদল এমপির মতে মে’কে সরিয়া যাইতে হইলে দলের ভিতর হইতে কেউ একজনকে প্রধানমন্ত্রী বানাইবার পরিবর্তে পার্লামেন্ট নির্বাচনের কথাই ভাবিতে হইবে। বস্তুত মে নিজেও এই ভীতি-কার্ড খেলিয়া তাঁহার সহিত দ্বিমত পোষণকারী দলীয় এমপিদেরকে দমাইয়া রাখিতে চাহিতেছেন। বস্তুত ব্রেক্সিট-বিপাকে পড়িয়া থেরেসা মে ও তাঁহার সরকার এতটাই তালগোল পাকাইয়া ফেলিয়াছে যে, নির্বাচন হইলে দলের পরাজয় অবধারিত বলিয়াই অনেক বিশ্লেষক মনে করিতেছেন। থেরেসা মে এখনো আশা করিতেছেন যে, পার্লামেন্ট নির্বাচনে নিজেদের আসন হারাইবার আশঙ্কার কারণেই শেষাবধি বিদ্রোহী এমপিরা পার্লামেন্টে অনুষ্ঠিতব্য ভোটাভুটিতে তাঁহার পক্ষে থাকিবে। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহের অভিজ্ঞতা মে-এর অনুমানের পক্ষে কথা বলিতেছে না। ব্রেক্সিট লইয়া ব্রিটেন কেবল দেশের ভিতরেই বিপাকেই পড়ে নাই। ইইউ ক্রমশই ব্রেক্সিট প্রসঙ্গে ব্রিটেনকে কড়া শর্তের মধ্যে লইয়া যাইতেছে। জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো দেশের শক্ত অবস্থানও মহাদেশীয় পর্যায়ে ব্রিটেনের অবস্থান অনেকখানি দুর্বল করিয়া ফেলিয়াছে বলিয়া মনে হইতেছে।
শনিবারের সমাবেশ হইতে ব্রেক্সিট লইয়া নূতন গণভোটের যেই দাবি উঠিয়াছে, তাহা লইয়াও বড় ধরনের অস্বস্তিতে পড়িতেছেন থেরেসা মে। এক মিলিয়ন মানুষের একযোগে উপস্থাপিত এই দাবি পাশ কাটাইয়া যাওয়া শুধু থেরেসা মে নহে যে কাহারো জন্যই অতিশয় কঠিন বলিয়া গণ্য করিতে হইবে। এইদিকে, একাধিক জনমত জরিপে গণভোট হইলে ব্রেক্সিটের বিপক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পড়িবে বলিয়া জানানো হইয়াছে। এমত জটিল পরিস্থিতিতে থেরেসা মে প্রধানমন্ত্রিত্ব বাঁচাইতে পারিবেন বলিয়া মনে করা লোকের সংখ্যা ক্রমশ কমিয়া আসিতেছে।