এখনো ষড়যন্ত্র চলছে

১৯৭১-এর এদিন থেকে বাংলাদেশের জনগণকে পাকিস্তানের শোষণ হতে রক্ষা ও সর্বসাধারণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি আনার লক্ষ্যে পাকহানাদারদের বিরুদ্ধে বাংলা মায়ের সাহসী সন্তানরা ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু হয় আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম। অবশেষে নয় মাস পর ১৬ই ডিসেম্বর আসে বিজয়, আমাদের সফলতা। কিন্তু স্বাধীনতার এতদিন পর আমরা আমাদের সব লক্ষ্য অর্জন করতে পারিনি। এখনও দেশ হতে দরিদ্রতা পুরোপুরি দূর হয়নি। আমরা সবার জন্য বাসস্থান নিশ্চিত করতে পারিনি। মানসম্মত চিকিত্সা সেবা সবার জন্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। আমরা যারা বাংলাদেশের সচেতন নাগরিক, যারা বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত আছি; সবার উচিত যার যার অবস্থান হতে দেশের পিছিয়ে পড়া জনগণের জন্য কিছু করা। ১৬ কোটি জনগণের একটি দেশে সবার সততা, পরিশ্রম ও সহযোগিতাই পারে দেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে; আপামর জনগণের জীবনের উন্নয়ন করতে।

এটা ঠিক যে, স্বাধীনতার পর এত বছরে আমরা অনেক এগিয়েছি। নারীর ক্ষমতায়নে আমরা অনেক দেশ (যেমন ভারত বা নেপাল) থেকে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে। শিশু মারা যাবার হার অনেক কমে গেছে। দেশ স্বাধীন না হলে এসব উন্নতি কখনো হতো না। আমরা পারতাম না আমাদের স্বাধীন মতের প্রকাশ করতে। আমাদের নিজেদের মত করে ভাবতে বা কিছু করতে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ২৬শে মার্চ হলেও মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি হয় ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। তারপর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-এর ৬ দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ‘সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ’ কর্তৃক ১১ দফা আন্দোলন, ’৭০-এর সাধারণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে আমরা মুক্তিযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যে, ৪৭-৭১ পর্যন্ত এক ধারাবাহিক রাজনীতির ফসল, যার নেতৃত্বে ছিলেন রাজনীতিকরা আর কেন্দ্রীয় চরিত্রে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। রাজনীতির বিপরীতে সামরিক তান্ত্রিকতাকে দাঁড় করিয়ে পাকিস্তানি দর্শনের আলোকে বাংলাদেশকে সাজাবার অপপ্রয়াস চালানো হয়। সুতরাং, ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবসকে আমাদের ইতিহাসের চেতনার আলোকে দেখতে হবে। তাহলেই আমরা এক উন্নত বাংলাদেশের পথে অগ্রসর হতে পারবো।

স্বাধীনতার এ মহান দিনে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে আরো বেগবান করতে সকল নাগরিককে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। মহান স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল একটি সুখী ও সমৃদ্ধ দেশ গড়া। সে লক্ষ্য অর্জনে বর্তমান সরকার নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। একাত্তরের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার প্রকাশ ঘটে এই জাতির সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য সংরক্ষণ, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সুশাসন ও আশীর্বাদ দেশের প্রত্যেকের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার দৃঢ় সংকল্পে। স্বাধীনতার চেতনাকে ধারণ করতে হবে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দিতে হবে। সংবিধান, গণতন্ত্র ও সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে বানচাল করতে স্বাধীনতা বিরোধী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী এবং গণতন্ত্র বিরোধী শক্তির ষড়যন্ত্র এখনো চলছে। দেশবাসীকে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও দেশ বিরোধী যে কোনো ষড়যন্ত্র ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করতে হবে। কত যে নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষ প্রাণ দিয়ে আমাদের জন্য রেখে গেছে সাধের স্বাধীনতা তার কোনো হিসেবও করা সম্ভব না। তাদের ঋণ অপরিশোধ্য। তাদেরই রক্তধারার ফলে লক্ষ শহীদ যোদ্ধা ভাইয়ের-বোনের আত্মত্যাগের নাম  বাংলাদেশ। কেননা ২৬শে মার্চ আমাদের জাতির আত্মপরিচয় অর্জনের দিন। পরাধীনতার শিকল ভাঙার দিন। আসুন, সব ভেদাভেদ ভুলে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের উন্নয়ন ও গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাই।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়