আমরা বর্তমান তরুণ প্রজন্ম ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধ দেখি নাই, দেখার কথাও নয়। তবুও আমরা মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিশ্বাসী, আত্মপ্রত্যয়ী এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষায় সর্বদা সচেষ্ট। আমরা মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা শুনেছি বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি কিংবা স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট হতে; মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, তাত্পর্য, প্রেক্ষাপট, কেন মুক্তিযুদ্ধ হলো— এসব নিয়ে লেখা প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা পড়েছি পাঠ্যবইসহ পত্র-পত্রিকা ও বিভিন্ন লেখকের বই থেকে; মুক্তিযুদ্ধের নানা ঘটনা নিয়ে নির্মিত তথ্যবহুল চলচ্চিত্র, নাটক, প্রামাণ্যচিত্র আমাদেরকে উপলব্ধি করিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো কেমন ছিল, বাঙালি জাতি মুক্তির জন্য কতটা ত্যাগ স্বীকার করেছেন। পরাধীনতার বেড়াজাল হতে মুক্তির জন্য বুকের তাজা রক্ত দিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন, নারীরা ইজ্জত সমর্পণ করেছেন। এসব এখন শুধু উপলব্ধির বিষয়। তাই আমাদের তরুণ প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধকে আত্মীকরণের প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে মুক্তিযুদ্ধকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করা।
প্রতি বছর যেদিন ২৬শে মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস আসে, আমরা উপলব্ধি করি, ১৯৭১ সালের আজকের এই দিনে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। বাংলাদেশকে পাক হানাদার মুক্ত করতে বাংলার আপামর জনগণ দৃঢ় মনোবল নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তাদের ছিল না সুসজ্জিত গাড়িবহর, ছিল না শক্তিশালী অস্ত্র। কোন বলে তারা যুদ্ধক্ষেত্রকে ‘কোমল বাগান’ ভেবে জীবন মরণ বাজি ধরল, এসব তরুণ প্রজন্মকে নিদারুণ ভাবায়। আবার ১৬ই ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস আসলে আমরা উপলদ্ধি করতে পারি, ১৯৭১ সালের আজকের এই দিনে বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেছিল। তরুণ প্রজন্ম আবারও আবেগপ্রবণ হয়ে যায়, বাংলার মুক্তিকামী মানুষগুলোর সংগ্রামের প্রগাঢ়তার বিষয়বস্তু উপলদ্ধি করে। যেখানে পাকস্তানিরা বোমা-বারুদ জ্বালিয়েছে, সেখানে বাঙালিরা কিভাবে সেসব মোকাবিলা করেছে? নিশ্চিত দেশের প্রতি অগাধ ভালোবাসা সকল প্রতিকূলতাকে মোকাবিলার ক্ষেত্রে উত্সাহ যুগিয়েছে।
দেশপ্রেমের এমন অবিস্মরণীয় ঘটনাপ্রবাহ তরুণ প্রজন্মকে অবশ্যই অনেক কিছু শিক্ষা দেয়। যখন নানা উত্সাহ-উদ্দীপনা আর আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ এই দিবসগুলো পালন করতে দেখি, তখনই গভীর এক ভাবনার সাগরে হারিয়ে যাই এই ভেবে যে, মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার মর্যাদাকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে টিকিয়ে রাখতে হবে।
১৯৭১ সালে শুধু এক শ্রেণির মানুষের সুবিধা ভোগের জন্য স্বাধীনতা অর্জিত হয় নাই। সে সময় দেশ মাতৃকার প্রবল টানে দল, মত নির্বিশেষে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল স্বাধীনতা সংগ্রামে। উদ্দেশ্য ছিল, খাই বা না খাই আমরা সকল বাঙালি একই ছায়াতলে থাকব। এমন ধ্রুব সত্য বিবেচনায় বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সকল বাঙালির মুক্তির জন্য দ্ব্যর্থ কণ্ঠে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। যার কাছে যা আছে তাই নিয়ে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল’। তিনি এমন কিছু বলেন নাই, যারা আমার দল কর, তারাই শুধু যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়। সত্যই, আমরা তরুণ প্রজন্ম ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েছি, বঙ্গবন্ধু ছিলেন প্রকৃত রাষ্ট্রনায়ক যার কাছে মানুষের বাঁচার অধিকার ছিল মোক্ষম। সবাইকে বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টা ছিল একচ্ছত্র দেশপ্রেমের নমুনা। তার দৃষ্টিতে দেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ ছিলেন তার ভাই, আপনজন।
বর্তমান তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা, কারও প্রতি বৈষম্য নয়। স্বাধীনতার প্রকৃত লক্ষ্য যদি বৈষম্য, একচ্ছত্র অধিকারতন্ত্র হতো, তবে অনেক আগেই স্বাধীনতা বিলুপ্ত হতো। তবে স্বাধীনতা বিলুপ্ত না হলেও বাংলাদেশে স্বাধীনতার চরম অপব্যবহার চলছে এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। একটি সুন্দর দেশ গড়তে স্বাধীনতার অপব্যবহার রুখতে হবেই। স্বাধীনতার মান বজায় রাখতে হবেই। স্বাধীনতাকে হরণ করে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার হতে দেওয়া যাবে না। তরুণ প্রজন্মকে স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস জানতে দিতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব দিতে হবে। কেননা, পরবর্তীকালে স্বাধীনতার রক্ষাকবচ হতে পারে একমাত্র তরুণ প্রজন্ম। স্বাধীনতা দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হোক, সে প্রত্যাশা করছি।
n লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউবিটি), ঢাকা