মাথার চুলগুলো সাদা হয়ে গেছে। চোখ-মুখ জুড়ে কেবলই হতাশা, অপ্রাপ্তি আর বিষণ্নতার ছাপ। জেঁকে বসেছে সংসারের অজস্র চাহিদাও। বুকের ভেতরে কষ্টের দগদগে ক্ষত নিয়ে বেশ আনমনা হয়ে গেছেন মো. ফিরোজ আল আসাদ। বয়সও ফুরিয়ে আসছে তার। তিনি নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার লোকমানপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ফুট অ্যান্ড ভেজিটেবল কাল্টিভেশন বিষয়ের ট্রেড ইন্সট্রাক্টর মো. ফিরোজ আল আসাদ। মানুষ গড়ার এই কারিগর জীবন-জীবিকার তাগিদে বেছে নিয়েছেন রাজপথে মানুষ বহনের কাজ। বয়সের অন্তিমলগ্নে এসে শুরু করেছেন জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়।
নিজেকে সপে দিয়েছেন অটোরিকশায়। হ্যান্ডেল হাতে মরণপণ সংগ্রাম করছেন প্রতিনিয়ত। মো. ফিরোজ আল আসাদ নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার লোকমানপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ফুট অ্যান্ড ভেজিটেবল কাল্টিভেশন বিষয়ের ট্রেড ইন্সট্রাক্টর। একযুগ আগে তিনি ওই স্কুলে শিক্ষক হিসাবে চাকরি নিয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু ভাগ্যের নির্মমতা তাকে মর্যাদার পরিবর্তে দিয়েছে তিরস্কার। বেতনহীন চাকরি করছেন ১২ বছর ধরে। অসুস্থ মায়ের ওষুধ আর সংসারের খরচ জোগাতেই তিনি এভাবে একবছর ধরে অটোরিকশা চালাচ্ছেন। সম্প্রতি যাত্রী নিয়ে এসেছিলেন গুরুদাসপুরে। তখন কথা হয় এই সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষকের সাথে।
শিক্ষক ফিরোজ আল আসাদ বলেন, স্ত্রী সাবিনা ইয়াছমিনসহ চার সদস্যর সংসার তার। ২০০৫ সালে তিনি শিক্ষক হিসাবে ওই স্কুলে চাকরি নেন। ১২ বছর অপেক্ষার পরও স্কুলটি এমপিওভুক্তি হয়নি। অভাবের তাড়নায় বাধ্য হয়ে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে একটি অটোরিকশা কিনেছেন। সকালে স্কুুলে ক্লাস করান আর বিকালে অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সরকারের ভৌতিক নিয়মের বেড়াজালে আটকে পড়েছে ফিরোজের মতো অসংখ্য শিক্ষকের ভাগ্য। বিধি অনুযায়ী স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও অনার্স পর্যায়ে নিয়োগ দেওয়া হলেও নিয়োগপ্রাপ্ত এসব শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি ও স্তর পরিবর্তন হয়নি। ডিরেক্টর জেনারেলের (ডিজি) হাতে ঝুলে রয়েছে এদের ভাগ্য।
ফলে ননএমপিও এসব শিক্ষক জীবিকার তাগিদে শিক্ষকতার পাশাপাশি বেছে নিয়েছেন ভিন্ন পেশা। এমপিওভুক্তির দাবিতে রাজপথে সংগ্রাম করতে গিয়ে রক্ত দিয়েছেন অনেক শিক্ষক। পুলিশের লাঠিচার্জ, জলকামান-মরিচের গুঁড়ায় স্তব্ধ হয়েছে দাবি আদায়ের এসব কণ্ঠ। কিন্তু জাতির বিবেক নামক এসব শিক্ষকের পাশে দাঁড়ায়নি কেউ। গুরুদাসপুর উপজেলা শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, গুরুদাসপুর উপজেলার দু’টি অনার্স ও ডিগ্রি স্তর পরিবর্তনসহ ১৬ প্রতিষ্ঠান নন-এমপিও রয়েছে। এখানে কর্মরত আছেন দুই শতাধিক শিক্ষক-কর্মচারী। রোজী মোজাম্মেল মহিলা অনার্স কলেজের ডিগ্রি (৩য়) শিক্ষক মো. লাভলুর রহমান বলেন, ১৬ বছর আগে তিনি এই প্রতিষ্ঠানে প্রভাষক হিসাবে যোগদান করেছেন। চোখের সামনে বিনাবেতনে কতজনকে অবসরে যেতে দেখেছেন, দেখেছেন এমপিওর আশায় থাকা সহকর্মীর অকাল মৃত্যু। তাদের মতো শিক্ষকদের এমন করুণ পরিণতি চান না তিনি।
উপজেলা কলেজ শাখা শিক্ষক সমিতির সভাপতি উপাধ্যক্ষ মো. আবুল কাশেম বলেন, বিএনপি সরকারে আমলে করা সরকারি আদেশ (জিও) নিয়ম করায় এমপিওকরণে ও স্তর পরিবর্তনে জটিলতা তৈরি হয়। এরপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে অল্প সংখ্যক প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি করেন। তার পর থেকে এ পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠান এমপিও বা স্তর পরিবর্তন হয়নি। এতে ননএমপিও প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত শিক্ষক-কর্মচারীরা বছরের পর বছর মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এসব শিক্ষকের কথা বিবেচনা করে এমপিও ও স্তর পরিবর্তনে সরকারি হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
ইত্তেফাক/এএন