একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে সবাইকে কাজ করতে হবে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে সকলকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘আজ ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস। ইতিমধ্যে আমরা কিছু উদ্যোগ নিয়েছি— যেন এই দিনটি গণহত্যা দিবস হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায় সেজন্য আমাদের প্রচেষ্টা চালাতে হবে।’ গতকাল সোমবার সকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে স্বাধীনতা পুরস্কার ২০১৯ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি একথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের উন্নয়ন বৃদ্ধি এবং দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার চিন্তা থেকেই বাকশাল করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। জাতির পিতা যে পদ্ধতিটা নিয়েছিলেন, এটা যদি কার্যকর করা যেত তাহলে বাংলাদেশে আর কখনো জনগণের ভোটের অধিকার নিয়ে কেউ খেলতে পারত না। জনগণ তার পছন্দ মতো প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করতে পারত।’

স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে জাতির পিতার কর্মসূচি ও দেশি-বিদেশি বিভিন্ন চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের কথা তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এমনই একটি অবস্থার মাঝে জাতির পিতা সিদ্ধান্ত নেন, যে করেই হোক আমাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে। দেশের উন্নয়ন বাড়াতে হবে এবং দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। সেই চিন্তা থেকেই তিনি বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ। যেটাকে সংক্ষিপ্ত রূপে বাকশাল নামে পরিচিত করানো হয়েছিল। বাকশাল গঠনের পর এর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়েছিল।’

প্রধানমন্ত্রী দেশের ১৩ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠানকে স্ব স্ব ক্ষেত্রে গৌরবময় ও অসামান্য অবদান রাখার স্বীকৃতি স্বরূপ অনুষ্ঠানে স্বাধীনতা পুরস্কার-২০১৯ প্রদান করেন। গত ১০ মার্চ এ বছরের স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য ১৩ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠানের নাম ঘোষণা করে সরকার। পুরস্কারের জন্য মনোনীত ব্যক্তিগণ হচ্ছেন— স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবী মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী (মরণোত্তর), শহীদ এ টি এম জাফর আলম (মরণোত্তর), এ কে এম মোজাম্মেল হক, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, ড. কাজী মিসবাহুন নাহার, আব্দুল খালেক (মরণোত্তর) ও অধ্যাপক মোহাম্মাদ খালেদ (মরণোত্তর), শওকত আলী খান (মরণোত্তর), চিকিত্সা বিজ্ঞানে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নুরুন্নাহার ফাতেমা বেগম, সমাজ সেবায় ড. কাজী খলীকুজ্জামান আহমেদ, সংস্কৃতিতে মুর্তজা বশীর, সাহিত্যে হাসান আজিজুল হক, গবেষণা ও প্রশিক্ষণে অধ্যাপক ড. হাসিনা খাঁন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব এগ্রিকালচারকে (বিআইএনএ) এ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। পুরস্কার হিসেবে ৩ লাখ টাকার চেক, ১৮ ক্যারেট স্বর্ণের ৫০ গ্রাম ওজনের একটি পদক এবং সনদপত্র প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাধীনতা পুস্কারপ্রাপ্তদের পক্ষে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন অনুভূতি ব্যক্ত করে বক্তৃতা করেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহম্মদ শফিউল আলম অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন এবং পদক বিজয়ীদের পরিচিতি তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের এক দশকের প্রচেষ্টার ফলে এই অর্থ বছরের শেষ নাগাদ জাতীয় প্রবৃদ্ধি আমরা ৮ ভাগে নিয়ে যেতে সক্ষম হব। আমাদের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৭৫১ ডলার থেকে বেড়ে ১ হাজার ৯০৯ মার্কিন ডলার হতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আজকের বাংলাদেশ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল।

পঁচাত্তরের পরে নির্বাচন ব্যবস্থা ধসে পড়া এবং শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস ও অপরাজনীতির অনুপ্রবেশের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ তথা বাকশাল প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য আলোচনায় তুলে ধরেন। ’৭৩-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বাইরে থাকা দলগুলো ৯টি আসনে জয়লাভ করেছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা কখনো নির্বাচনে জয়ী হতে পারে না সেসব রাজনৈতিক দলের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে জাতির পিতা বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ গড়েছিলেন। এটি একটি জাতীয় ঐক্যভিত্তিক প্লাটফর্ম ছিল। যেখানে ঐক্যের মধ্যদিয়ে সকলেই দেশের কাজ করবে এবং সেখানে সমাজের সর্বস্তরের জনগণকে সম্পৃক্ত করে তিনি উন্নয়নের ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা যেই ব্যবস্থাটা নিয়েছিলেন সেটা কার্যকর করা গেলে বাংলাদেশে জনগণের ভোটের অধিকার নিয়ে আর কেউ খেলতে পারতো না। নিজের মনের মতো প্রার্থীকে ভোট দিয়ে জনগণ নির্বাচিত করতে পারতো।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা সেসময় নির্বাচনের যে পদ্ধতি করেছিলেন সে অনুযায়ী যার যার নির্বাচন সে সে করতে পারবে। নির্বাচনের খরচ প্রতিটি প্রার্থীকে দিয়ে দেওয়া হবে রাষ্ট্রের তরফ থেকে। প্রতি আসনের জন্য পৃথক একটি করে পোস্টারে সকল প্রার্থীর নাম ছাপিয়ে দেওয়া হবে কাজেই জনগণের সাথে যার যোগাযোগ আছে, সম্পৃক্ততা আছে তারা নির্বাচিত হবেন। অর্থাত্ ভোটের অধিকার তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের কাছে যাতে পৌঁছায়, তারা যেন স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারে সেই সুযোগ তিনি করে দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দু’টি নির্বাচন হয়েছিল সেসময়। এর একটি কিশোরগঞ্জে অপরটি পটুয়াখালীতে। সেখানে বড় কোনো দলের কেউ নয়, সাধারণ একজন স্কুল মাস্টার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিল। অর্থাত্ অর্থ-বিত্ত দিয়ে কেউ নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারেনি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার একটা কথা ছিল একটা বিপ্লবের পর সমাজে একটা বিবর্তন আসে। যেসব দেশ মুক্তিযুদ্ধ করেছে সেসব দেশেই এমনটি হয়, পরিবর্তন বা বিবর্তনের পরে কিছু লোক আর্থিকভাবে শক্তিশালী হয়ে যায়। সেটা যেন সমাজে স্থান না পায় সেদিকে লক্ষ্য রেখেই তিনি এই বাকশাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে আমাদের জনসংখ্যা বেশি এবং চাষের জমি কম থাকায় সেখানে তিনি ব্যবস্থা নিয়েছিলেন সমবায়ের মাধ্যমে আমাদের দেশে উত্পাদন হবে। তিনি বলেন, জমির মালিকানা মালিকের কাছেই থাকবে। কোনো মালিকানা নেওয়া হবে না। কিন্তু জমিটি সমবায়ের মাধ্যমেই চাষাবাদ হবে। উত্পাদিত ফসলের একটা অংশ যারা শ্রম দেবে তারা পাবে, একটা অংশ মালিক পাবে আর একটা অংশ পাবে সমবায় এবং আধুনিক প্রযুক্তি কৃষিতে ব্যবহার করে উত্পাদন বাড়ানো হবে।

ড. কুদরত-ই-খুদাকে প্রধান করে শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাস্তবায়নকালেই ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করায় সে রিপোর্ট আর বাস্তবায়িত হতে পারেনি উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, ‘তিনি বেঁচে থাকলে আর ৫-৭ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ উন্নত এবং সমৃদ্ধশালী হয়ে গড়ে উঠতে পারতো।’

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়া, মন্ত্রিপরিষদ সদস্যগণ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, বিচারপতিগণ, সংসদের সদসগণ, তিন বাহিনী প্রধানগণ, বিদেশি কূটনীতিকবৃন্দ, সরকারের পদস্থ সামরিক এবং বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ, মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিবিদ কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী এবং দেশবরেণ্য ব্যক্তিবর্গসহ আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।