শোভন শিকদার নদীভাঙা এক যুবক। বাড়ি পুড়ে গেলে অথবা ডাকাতে লুটে নিলে এত ক্ষতি হয় না, নদী ভাঙায় যে-ক্ষতিটা হয়। সবই যায়। কিছুই থাকে না। শোভনের অবস্থা তথৈবচ। ঘন তমসাচ্ছন্ন। ছোট নাবালক দুটি ভাইবোন। বয়েসী বাবা-মা। এসব নিয়ে দুঃখ-দুর্দশায় জর্জরিত শোভন। তার এখন দীর্ঘশ্বাসই সাথি। শোভনের মনে আছে, যেদিন বাড়িভিটার শেষ ঘরটি নদীতে গেল, সেদিনের মার চোখের জলের অবিরল ধারার কথা। সে কী করুণ বিলাপের আকুলকরা কান্না! নদীপাড়ের পরিত্যক্ত সড়কে মাত্র দুটি ঘর ওদের। তা-ই আশ্রয়স্থল। খেয়ে না-খেয়েই দিনগুলো যায়।
শোভনের আইএ পাস হয় নদীতে বাড়িবিলীন হওয়ার আগে। এক বছরের মধ্যেই ওদের সর্বনাশটা হয়। স্বভাব-চরিত্রে-পড়াশোনায় ও বরাবরই ভালো। বছর-বছরই ও ক্লাসে প্রথম। ওর লেখালেখির একটু অভ্যাসও আছে। শোভনের আইএ পাসটা আশপাশের লোকজন খুব বড় করে দেখে। ঢাকা যাওয়ার কথাও বলে তারা। সেখানে কিছু-একটা তো হবেই। নদীভাঙা-মনভাঙা শোভন কী করবে কিছুই ভেবে পায় না। এ-নিয়ে বাবা-মার সঙ্গে কথা হয় ওর। একদিন ও পাড়ি জমায় ঢাকায়। দূর-সম্পর্কের এক মামার বাসায় গিয়ে ওঠে। মামাটা দারুণ স্নেহশীল মানুষ। কয়দিন শোভন হেঁটে হেঁটে এখানে-ওখানে ঢু মারল। এরমধ্যে এক পত্রিকায় ওর চাকরি হয়ে গেল। অফিসেই থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা। যে-কয় টাকা ও পাবে—সবটাই বাবা-মাকে দিতে পারবে। এজন্য ও অনেকটা খুশি। কিছুদিনের মধ্যেই কাজের সঙ্গে ওর দিনগুলো যেন একাট্টা হয়ে গেল। চাকরির ক্ষেত্রে যে-পোশাক-আশাক দরকার, তা ওর নেই। ওর যা আছে তা হলো মুগ্ধ করার মতো কর্মনিষ্ঠা, সততা আর সুন্দর ব্যবহার।
রাইসু ইসলাম ছদ্মনামে লেখালেখির চর্চাটা ওর অব্যাহত আছে। কিন্তু বিষয়টা ও গোপন রাখে। দুটি লেখা প্রকাশের পর গোপনীয়তা থাকে না। সহকারী সম্পাদক মানিক সরকার বিষয়টি জানতে পারেন। এরপর থেকে ওর লেখা মাঝে মাঝেই প্রকাশ পেতে থাকে। একদিন সম্পাদক সাহেব মানিক সরকারকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘রাইসু ইসলামটা কে? ওর লেখা তো বেশ ভালো।’
সহকারী সম্পাদক উত্তরে বললেন, ‘ঐ যে পাজামা-পাঞ্জাবি পরা ছেলেটি পত্রিকায় কাজ করে, আমাদের শোভন শিকদার। ওরই লেখা।’
সম্পাদকের এ-অভিব্যক্তির সময় শোভন অফিসে ছিল না। পরে মানিক সরকার ব্যাপারটি তাকে জানান। সম্পাদকের স্বীকৃতি যেন ওর মনের সৌন্দর্যচ্ছটার প্রতিফলন। তবে কর্মক্ষেত্রে কিছু বাঁকা বুদ্ধির মানুষ শুভ-সরল বুদ্ধির মানুষের সুন্দর কাজ ঢেকে দিয়ে আনন্দ পায়। ওরা কাজ ছাড়া চাতুর্যকে বড় করে দেখে। কিন্তু সম্পাদক মানিক সরকার খাঁটি জহুরি। তিনি মানিক হয়ে মানিক চেনেন। তাই একদিন শোভনের চাকরিটা একধাপ উপরে উন্নীত হলো। বেতনও বাড়ল। একদিন পত্রিকার টেবিলে অনেকের সামনে তিনি বলেই ফেললেন, ‘শোভন শিকদার আমার আবিষ্কার।’