সতর্কবার্তাটি নূতন নহে। বিশ্বের নামিদামি চিকিত্সা-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন যাবত্ অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার বিষয়ে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করিয়া আসিতেছেন। তাহাদের সেই সতর্কবার্তা কঠোরভাবে অনুসৃতও হইতেছে উন্নত দেশগুলিতে। পিছাইয়া নাই উন্নয়নশীল কিছু কিছু দেশও। কিন্তু বিশ্বের বহু দেশের সামগ্রিক চিত্রটি এখনো হতাশাব্যঞ্জকই বলিতে হইবে। প্রাথমিক চিকিত্সা সেবা ও ঔষধ রফতানিসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ক্ষেত্রে তাক-লাগানো সাফল্য সত্ত্বেও বাংলাদেশও যে ইহার ব্যতিক্রম নহে তাহা সুবিদিত। চিকিত্সা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের চোখের সম্মুখেই মুড়ি-মুড়কির মতোই অ্যান্টিবায়োটিকের বিক্রয় ও ব্যবহার চলিতেছে। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক দূরে থাকুক, নিবন্ধিত সাধারণ চিকিত্সকের (জিপি) ‘প্রেসক্রিপশন’ ছাড়াই যেমন অবাধে বিক্রয় হইতেছে এইসকল অ্যান্টিবায়োটিক, সাধারণ মানুষও তেমনি কোনো প্রকার বাছবিচার ছাড়াই তাহা গলধঃকরণ করিতেছেন। আবার আমরা যেইসকল মাছ-মাংস ও শাকসবজি খাই, তাহার মাধ্যমেও বিপজ্জনক সব অ্যান্টিবায়োটিক প্রবেশ করিতেছে আমাদের দেহে। অনিবার্যভাবে ইহার মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাবও স্পষ্ট হইতে শুরু করিয়াছে। সম্প্রতি বিবিসির এক প্রতিবেদনে দৃষ্টান্তসহযোগে যেই চিত্র তুলিয়া ধরা হইয়াছে তাহাকে আতঙ্কজনক বলিলে বোধ করি অত্যুক্তি হইবে না। প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, সম্প্রতি ঢাকা শিশু হাসপাতালে আট বছরের এক শিশুর প্রস্রাব পরীক্ষা করিয়া দেখা যায়, ১৮টি অ্যান্টিবায়োটিকের মধ্যে ১১টিই রেজিস্টেন্ট আসে। ঢাকার আরেকটি হাসপাতালে এক নবজাতকের মেডিক্যাল পরীক্ষাতেও ১৮টি অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্ট পাওয়া যায়। ইহার সোজাসাপ্টা অর্থ হইল, এইসকল অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করিতেছে না। যেইসকল ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক বা পরজীবী ধ্বংস করিবার জন্য এই ঔষধ প্রয়োগ করা হয়—তাহারা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ করিয়া টিকিয়া থাকিবার ক্ষমতা অর্জন করিয়া ফেলিয়াছে। ইহার পরিণতি ভাবিলেও শিহরিত হইতে হয়।
অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করিলে কী ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হইবে—তাহার খানিকটা আভাসও দিয়াছেন সংশ্লিষ্ট চিকিত্সা-বিজ্ঞানীরা। বর্তমান পরিস্থিতিকে ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য বড় ধরনের অশনি সংকেত আখ্যায়িত করিয়া তাহারা বলিয়াছেন, বিশ্বে যেই হারে নূতন অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করা হইতেছে, তাহার তুলনায় কয়েকগুণ অধিক হারে বাড়িতেছে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স। ফলে অদূর ভবিষ্যতে সামান্য হাঁচি-কাশি-জ্বরও মানুষের মৃত্যুর কারণ হইয়া দাঁড়াইতে পারে। তাহাদের মতে, একটি অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করিতে লাগে ১৫ বত্সর, অথচ ইহার বিপরীতে ব্যাকটেরিয়া রেজিস্ট্যান্স হইতে লাগে ইহার এক-দশমাংশেরও কম সময়। সম্ভাব্য এই বিপর্যয় রোধে কী করণীয় তাহা সংশ্লিষ্ট সকলেই জানেন; কিন্তু কেহই তাহা গ্রাহ্য করেন না। এমনকি কোনো কোনো চিকিত্সকের বিরুদ্ধেও ঢালাওভাবে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের অভিযোগ শোনা যায়—যাহা একেবারে ভিত্তিহীন বলা যাইবে না। সময় আসিয়াছে আন্তর্জাতিক মান বা মানদণ্ড অনুসরণ করিয়া কঠোরভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের। এই ক্ষেত্রে চারটি বিষয়ে প্রাথমিক সচেতনতার উপর গুরুত্ব আরোপ করিয়াছেন বিশেষজ্ঞরা। তন্মধ্যে প্রথম পরামর্শটিই হইল, চিকিত্সকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ করিতে হইবে। পাশাপাশি জ্বর, সর্দি, কাশি ও ডায়রিয়া—এই চারটি রোগ সারাইতে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো প্রয়োজন নাই। তাই চিকিত্সকগণকেও এই চারটি কন্ডিশনসহ যথেচ্ছভাবে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হইতে বিরত থাকিতে হইবে। সচেতনতা খুবই জরুরি সন্দেহ নাই, তবে প্রশাসনকেও কঠোর হইতে হইবে। মিষ্টির পাত্র উন্মুক্ত রাখিয়া মাছি তাড়ানো বুদ্ধিমানের কাজ নহে।