মোংলা বন্দরে চালু হচ্ছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জ্বালানি তেল স্থাপনা

এইচ এম দুলাল, মোংলা (বাগেরহাট) সংবাদদাতা

উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে মোংলা সমুদ্র বন্দরে নির্মিত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জ্বালানি তেল স্থাপনা ‘মোংলা অয়েল ইনস্টলেশন’। বন্দর প্রতিষ্ঠার ৬৯ বছর পর সরকারের জনগুরুত্বপূর্ণ তালিকায় স্থান পাওয়া এ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছে। এ কেন্দ্রে মজুত ও সংরক্ষণ করা হবে সকল ধরণের জ্বালানি তেল। আর এখান থেকে দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজসহ সকল প্রকার নৌযানে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হবে। এ ছাড়া দেশের উত্তর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত শিল্প প্রতিষ্ঠান পাবে জ্বালানি তেলের সুবিধা।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) আশা করছে এটি চালু হওয়ার পর বাণিজ্যিক জাহাজসমূহের জ্বালানি তেলের সংকট নিয়ে চলমান বিড়ম্বনা দূর হবে। একই সঙ্গে দেশের উত্তর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জ্বালানি তেলের সংকট অনেকটাই কমবে।

বিপিসির একটি সূত্র জানায়, চট্টগ্রামস্থ পতেঙ্গাতে তিনটি তেল বিপণন কোম্পানির (পদ্মা/মেঘনা/যমুনা) মেইন ইনস্টলেশন অবস্থিত। বর্তমানে দেশের জ্বালানি তেলের চাহিদা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়তে থাকায় তেল মজুদাগার বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। স্থান সংকুলানের অভাবে চট্টগ্রামস্থ মেইন ইনস্টলেশনে মজুদাগার বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়। সে কারণে মংলা বন্দরে স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। তাছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এটি একটি বিকল্প স্থাপনা হিসেবেও কাজ করবে। অর্থাত্ কোন কারণে চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে মংলার স্থাপনা থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

মোংলা অয়েল ইনস্টলেশন হতে কোস্টাল ট্যাংকারের মাধ্যমে দৌলতপুর, ঝালকাঠি, বরিশাল ডিপোসমূহ ও পাওয়ার প্লান্টসহ এ অঞ্চলের শিল্প প্রতিষ্ঠানে জ্বালানি তেল সরবরাহ সহজতর হবে। ট্যাংক লরির মাধ্যমে বাগেরহাট, পিরোজপুর, নড়াইল, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরিয়তপুর, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ জেলাসমূহে তেল সরবরাহ সহজতর হবে। তা ছাড়াও বর্তমানে নির্মাণাধীন রেল লাইন চালু হলে রেল ওয়াগানের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা যাবে। ফলে দেশের উত্তর-দক্ষিণাঞ্চলে জ্বালানি তেলের চাহিদা বহুলাংশে পূরণ করা সম্ভব। তদুপরি মোংলা বন্দরে আসা ফরেন শিপে বাঙ্কারিং-এর মাধ্যমে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা যাবে। এ ছাড়াও সহজে জ্বালানি তেল প্রাপ্তির ফলে মোংলা বন্দরে আগত দেশি-বিদেশি জাহাজ, ইপিজেড, বেজাসহ মোংলা বন্দর শিল্প এলাকায় অবস্থিত বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে লাভবান হবে ও তাদের কার্যক্রমে ব্যাপক গতিশীলতার সঞ্চার করা যাবে।

নবনির্মিত এ জ্বালানি তেল ডিপো প্রসঙ্গে মোংলা বন্দর ব্যবহারকারী ও শিপিং ব্যবসায়ী শেখ বদিউজ্জামান টিটু জানান, বিশ্বের সকল বন্দরে রয়েছে বাঙ্কারিং সুবিধা থাকলেও আঞ্চলিকতার শিকার হয়ে এতোদিন এ বন্দরে তেল ডিপো না থাকায় এটি অনেকটা মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হওয়াসহ মাদার ভ্যাসেল (জাহাজ) কোম্পানি, শিপিং এজেন্টসহ সংশ্লিষ্ট সকল ব্যবসায়ীকে নানা বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়েছে। জ্বালানি তেলের অভাবে অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ এ বন্দরে দিনের পর দিন আটকে থাকার ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়া মাদার ভ্যাসেলের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে হয়েছে। এতে যেমন অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হয়েছে, তেমনি সময় অপচয়সহ নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। তিনি আরো জানান, নতুন এ তেল ডিপোটি স্থাপিত হওয়ায় এ বন্দরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

মোংলা ওয়েল ইনস্টলেশন (বিপিসি) প্রকল্প কর্মকর্তা মোসাদ্দেক হোসেন জানান, এ প্রকল্পটির মেয়াদ আগামী জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই এর যাবতীয় কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এখন যে কোনো সময় এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে। তিনি আরো জানান, এটি চালু হলে জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিতসহ মোংলা বন্দরে বাণিজ্যিক জাহাজের আগমন ও কাজের গতি বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ-উত্তরাঞ্চলের শিল্প প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। এ জ্বালানি তেল স্টেশন থেকে দেশের সর্বত্র সকল প্রকার জ্বালানি তেল সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কমডোর একেএম ফারুক হাসান (বিএন) জানান, তেল ডিপোটি স্থাপিত হওয়ায় বাণিজ্যিক জাহাজে তেল সরবরাহ নিশ্চিত হবে। দূর হবে দীর্ঘদিনের চলমান ভোগান্তি। জ্বালানি তেলের অভাবে বাণিজ্যিক জাহাজসমূহকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এ সমস্যার সমাধান হবে এবং বিদেশিদের কাছে এ বন্দরের গুরুত্ব বাড়বে। সকল প্রকার জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত হওয়াসহ বন্দরে জাহাজের আগমন বৃদ্ধি ও আমদানি রপ্তানি পণ্যের চাপ বৃদ্ধিসহ বাড়বে কাজের গতি।