প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগকে পুনরায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আনতে প্রচার কার্যক্রম চালানোর জন্য দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, কেবলমাত্র আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে দেশের উন্নয়ন অব্যাহত থাকবে। অন্য কোনো দল ক্ষমতায় আসলে দেশ পিছিয়ে পড়বে। তিনি বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি অধিকতর উজ্জ্বল করতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আপনাদের নিজেদেরকে রাষ্ট্রদূতের মতো করে বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি তুলে ধরতে হবে।’
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে ফোর সিজনস হোটেলে অল ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগ আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনায় তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণে ‘বুদাপেস্ট ওয়াটার সামিট-২০১৬’তে যোগ দিতে ৪ দিনের দ্বিপক্ষীয় সফরে রবিবার বুদাপেস্ট পৌঁছান। পানি সম্মেলনে যোগদান শেষে গতকাল বুধবার স্থানীয় সময় সকাল সোয়া ১০টায় (বাংলাদেশ সময় বিকাল সোয়া ৩টা) বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ভিভিআইপি ফ্লাইট ‘আকাশ প্রদীপে’ তিনি দেশের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ দেশের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে। এ জন্যই আওয়ামী লীগ আন্তরিকভাবে দেশের উন্নয়ন চায়। দেশকে উন্নত করা আওয়ামী লীগের দায়িত্ব এবং এটি আমরা অব্যাহত রাখব ইনশাআল্লাহ্। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ জাতির পিতার হাতে গড়া দল। যে দল দেশের স্বাধীনতা নিয়ে এসেছে কেবল তারাই দেশের উন্নয়ন করতে পারে। অন্য কোনো দল তা পারবে না।
প্রধানমন্ত্রী প্রবাসী বাংলাদেশিদের আগামী সাধারণ নির্বাচনের প্রচার কার্যক্রম শুরুর আহ্বান জানিয়ে বলেন, আপনারা যখন দেশে ফিরবেন, গ্রামবাসীদের একটিই প্রশ্ন করবেন তারা উন্নয়ন চায় নাকি উন্নয়ন চায় না। আপনারা যখন দেশে যাবেন তখন নিজ এলাকার মানুষের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের সাফল্য চিত্র তুলে ধরবেন। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে একদল মানুষের বিক্ষোভের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, কিছু মানুষ আছে যারা সবকিছুই অপছন্দ করে। সবকিছুতে তারা দোষ-ত্রুটি দেখে। তারা বিক্ষোভ করতে থাকুক, আমরা আমাদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাব। তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের পর ২১ বছর পর্যন্ত যে দলগুলো রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল তাদের জবাবদিহি করতে হবে যে কেন তারা দেশের উন্নতি করতে পারেনি। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে স্থলসীমান্ত ও সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি করেছে। কিন্তু জিয়া, এরশাদ ও খালেদা জিয়ার সরকারের এসব ইস্যু উত্থাপনেরই সাহস ছিল না।
২০১৩ সালে নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই সময় আমি সর্বদলীয় সরকারে যোগ দিতে খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করেছিলাম। আমি তাকে (খালেদা) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেওয়ারও প্রস্তাব করেছিলাম। কিন্তু তিনি রাজি হননি, এমনকি নির্বাচনেও আসেননি। বরং তিনি নির্বাচন ভণ্ডুল করার চেষ্টা করেছিলেন। শেখ হাসিনা বলেন, খালেদা জিয়ার ছেলে কোকোর মৃত্যুর পর সমবেদনা জানাতে আমি তার (খালেদা) বাসায় গিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি বাসায় ঢোকার সুযোগ দেননি। বিগত সাধারণ নির্বাচনের পর ২০১৫ সালের প্রথম ৩ মাস খালেদা জিয়ার দলের সৃষ্ট নৈরাজ্য ও তাণ্ডবের তীব্র সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, ওই সময় তারা আন্দোলনের নামে ১৫৭ জন মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করেছে। আন্দোলনের নামে মানুষকে পুড়িয়ে হত্যাকারীরা দেশকে কী দেবে?
যুদ্ধাপরাধের বিচার সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে এবং ইতোমধ্যে এর কিছু রায় কার্যকরও হয়েছে। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান ও তার স্ত্রী খালেদা জিয়া যুদ্ধাপরাধীদের জেল থেকে মুক্ত করে এবং মন্ত্রী ও এমপি বানিয়ে পুনর্বাসন করেছেন। যারা যুদ্ধাপরাধীদের হাতে জাতীয় পতাকা দিয়েছেন তাদেরও যুদ্ধাপরাধীদের মতো একই শাস্তি ভোগ করা উচিত।
সংবর্ধনা সভায় সভাপতিত্ব করেন অল ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগ নেতা অনিল দাসগুপ্ত। বিভিন্ন ইউরোপিয়ান দেশ থেকে আগত আওয়ামী লীগ নেতারা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী এবং এলজিআরডি ও সমবায় মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ দ্রুতগতির অগ্রসরমাণ
দেশ :হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী
হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান বাংলাদেশকে বিশ্ববাসীর কাছে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যে ‘দ্রুতগতির অগ্রসরমাণ দেশ’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, তার দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে আগ্রহী। তিনি বলেন, ‘আমাদের বৈদেশিক নীতি প্রাচ্যের জন্য উন্মুক্ত। বিশ্বের দ্রুতগতিতে অগ্রসরমাণ দেশসমূহে হাঙ্গেরি রফতানি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাই বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও পূর্বের ব্যাপক সম্ভাবনায় দেশসমূহে সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-হাঙ্গেরি বিজনেস ফোরামের সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের শাক্তিশালী ও বৃহত্ রাষ্ট্রসমূহ বাংলাদেশের বিকাশমান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যের সম্ভাবনাময় দিকটি দেখতে পারে। বাংলাদেশ ও হাঙ্গেরির শীর্ষ পর্যায়ের বাণিজ্যিক সংগঠন বিজনেস ফোরাম এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে ব্যবসার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার উল্লেখযোগ্য দিকসমূহ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাঙ্গেরিয়ান ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ গ্রহণের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা হাঙ্গেরিয়ান কোম্পানিগুলোকে চামড়া ও জুতো, পাট, সিরামিক, পেট্রোকেমিক্যালস, খাদ্য ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত, প্লাস্টিক সামগ্রী, বিদ্যুত্, জ্বালানি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, টেলিকমিউনিকেশন ও আইসিটি, পানি ও মেরিন এবং অবকাঠামোসহ বিভিন্ন সম্ভাবনাময় সেক্টরে বিনিয়োগের জন্য স্বাগত জানাচ্ছি।’
বুদাপেস্ট ম্যারিয়ট হোটেলে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে এফবিসিসিআই সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমেদের নেতৃত্ব বাংলাদেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ এবং হাঙ্গেরি চেম্বার অব কমার্সের (এইচসিসি) ভাইস প্রেসিডেন্ট এইচ ফারেন্স মিকলোসের নেতৃত্বে হাঙ্গেরির শীর্ষ ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাগণ যোগ দেন। এ উপলক্ষে দুই দেশের শীর্ষ দুই ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআই ও এইচসিসির মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়।
অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশংসা করে হাঙ্গেরিয়ান প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শেখ হাসিনা সামান্য কয়েকজন নেতার মধ্যে একজন যাকে আমরা খুব সম্মান করি। তার সাহস ও নির্ভীকতার কারণে তিনি আমাদের জন্য একটি ভালো দৃষ্টান্ত। তিনি বিশ্বের একজন অত্যন্ত সাহসী নারী। খুব কমসংখ্যকই এমন নারী আছেন, যারা দেশের জন্য এমন নিবেদিত।’
ভিক্টর অরবান বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশে বন্যা সুরক্ষা, উপকূলীয় এলাকায় ভাঙন প্রতিরোধ এবং ড্রেনেজ সিস্টেম ও বর্জ্য পানি ব্যবস্থাপনায় আমাদের সহযোগিতা আরো জোরদারে সম্মত হয়েছি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় চেষ্টা করছি।’ তিনি বলেন, এক্সিম ব্যাংক অব হাঙ্গেরি ৯ কোটি ডলারের একটি তহবিল চালু করবে। আর বাংলাদেশ, হাঙ্গেরি বা পরস্পরের সঙ্গে ব্যবসারত কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এ অর্থ ব্যবহার করতে পারবে। হাঙ্গেরি সেদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য বাংলাদেশের ১শ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেবে বলেও তিনি জানান।
শেখ হাসিনা বলেন, হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফলপ্রসূ দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হওয়ায় তিনি খুবই খুশি। আমরা দুই দেশের মধ্যে দ্বিমুখী বাণিজ্য ও বিনিযোগ বাড়ানোসহ সম্পর্ক আরো গভীর ও জোরদার করতে একমত হয়েছি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দুই দেশের চেম্বারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক পারস্পরিক লাভজনক ব্যবসার সুযোগ সম্প্রসারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে।
ইত্তেফাক/এএন