রপ্তানিকারকদের পরামর্শ, রপ্তানিকারদের নীতি সহায়তা ছাড়া তাদেরকে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা করা, নতুন নতুন পণ্য রপ্তানির ব্যবস্থা, নতুন বাজার খুঁজে বের করার কাজ করে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণের মাধ্যমে রপ্তানি বাণিজ্যকে আরো বেশি গতিশীল করতে একটি রোডম্যাপ হাতে নিয়েছে সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটি। আর রোডম্যাপে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে একটি ছাতার নিচে নিয়ে আসারও পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
ইপিবির রোডম্যাপ অনুযায়ী কাজ হলে, রপ্তানি বাণিজ্যে গতি সঞ্চার হবে। স্বল্প সংখ্যক পণ্য ও দেশে পণ্য রপ্তানি যে ঝুঁকি তাও কমবে। রপ্তানি বাজার বাড়ানো এবং গুটিকতক পণ্যের উপর নির্ভরতা (এক্সপোর্ট কনসেনট্রেশন) থেকে বের হওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ও বেসরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাই নতুন উদ্যোগ রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য আশার আলো হিসাবে দেখা দিয়েছে। তবে এক্ষেত্রে রোডম্যাপের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ কতটুকু বাস্তবায়ন হয়, সেটাই দেখার বিষয়। এ রোডম্যাপ যেন শুধু কাগজে কলমে বা মুখে মুখেই থেকে না যায়, সেজন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে উদ্যোগ নেওয়ার বিকল্প নেই।
স্বাধীনতার পর থেকে বছর বছরই বাড়ছে রপ্তানী বাণিজ্যের পণ্য ও অর্থের পরিমাণ। আবার নতুন নতুন বাজারেও ঢুকছে বাংলাদেশি পণ্য। রপ্তানি বাণিজ্যের বিগত সময়ের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক যুগে দেশের রপ্তানি বাণিজ্য বেড়েছে কয়েকগুণ। তবে রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ ভাগই এসেছে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। আর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, ঘুরেফিরে কয়েকটি দেশেই আমাদের পণ্য যাচ্ছে। এ ধারা রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য এক ধরনের ঝুঁকি। অন্যদিকে সীমিত পণ্য ও বাজার এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় উত্পাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় টার্মস অব ট্রেড কমে যাওয়াও অন্যতম সমস্যা। এক ইউনিট রপ্তানির পরিবর্তে কত ইউনিট আমদানি করা যায় সেটাই টার্মস অব ট্রেড।
যেসব দেশে এক্সপোর্ট কনসেনট্রেশন বেশি তাদের টার্মস অব ট্রেড খুব কমে যায়। আর যেসব দেশ রপ্তানি বহুমুখীকরণ করতে পেরেছে তাদের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। একইসঙ্গে তাদের টার্মস অব ট্রেডও স্থিতিশীল হয়েছে। এজন্য এক্সপোর্ট কনসেনট্রেশন কমানোর মাধ্যমে টার্মস অব ট্রেড বাড়াতে হবে। বাড়ানো না গেলেও অন্তত স্থিতিশীল করার ব্যবস্থা করতে হবে।
রপ্তানি বাণিজ্যের সঙ্গে দেশের সার্বিক প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। রপ্তানি ভালো হলে বিনিয়োগ বাড়ে, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়। রপ্তানি বহুমুখীকরণের সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হয়। রপ্তানি বহুমুখীকরণ হলে টার্মস অব ট্রেড স্থিতিশীল থাকার পাশাপাশি রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও বাড়ে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সত্তরের দশকের দিকেও বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৯০ শতাংশ আসত পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে। সেখানেও এক্সপোর্ট কনসেনট্রেশনই ছিল বড় সমস্যা। তবে তখন আর এখনকার মধ্যে পার্থক্য হলো, সে সময়ে রপ্তানি খাত ছিল প্রাথমিক পণ্য নির্ভর। এখন শিল্পপণ্য নির্ভর।
রপ্তানি পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণের জন্য বিভিন্ন সময়ে নেওয়া সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ আশানুরূপভাবে কাজ করেনি। সুষ্ঠু পরিকল্পনারও অভাব ছিল। ফলে রপ্তানি বাণিজ্যে দেশ যতটা এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল সেভাবে এগুতে পারেনি। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রপ্তানি শিল্প ব্যাপক ভূমিকা রাখে। তাই এ রপ্তানি খাতে কোন কোন ধরণের নেতিবাচক ঘটনা ঘটলে তাতে বিপাকে পড়বে দেশের পুরো অর্থনীতি। এ শিল্পের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সরকারি সহায়তা খুবই দরকার। এজন্য ইপিবি যে রোডম্যাপ হাতে নিয়েছে তা বাস্তবায়ন করা গেলে এ খাতে আয়ের পরিমাণ বাড়বে বলেও উদ্যোক্তারা মত দিয়েছেন। আর এ প্রকল্প বাস্তবায়নে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আরও বেশি এগিয়ে আসতে হবে।
পণ্যের বহুমুখিকরণ না হলে এবং রপ্তানির গন্তব্য না বাড়লে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অর্থনীতির মূল শক্তি রপ্তানি হলেও বাংলাদেশ সীমিতসংখ্যক পণ্য রপ্তানি করছে। আর এসব পণ্যও রপ্তানি হচ্ছে হাতেগোনা কয়েকটি দেশে। এজন্য রপ্তানির পণ্যের বহুমুখীকরণ না করলে পারলে বা যে কোন কারণে আমদানিকারকদেশগুলো আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়তে পারে। রপ্তানির বহুমুখীকরণ ছাড়া এ খাতে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাটা কঠিন চ্যালেঞ্জ।
ইপিবি তথ্যমতে, গত অর্থ বছর দেশ থেকে ৭০৫টি পণ্য রপ্তানি হয়েছে। সংখ্যার দিক থেকে বিশাল হলেও তৈরি পোশাক শিল্পের বাইরে হিমায়িত খাদ্য এবং পাট ও পাটজাত, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে রপ্তানি আয় কিছুটা বেশি থাকলেও অন্যান্য পণ্য থেকে রপ্তানি আয় খুবই কম। গত অর্থবছরের (২০১৫-১৬) মোট রপ্তানি আয়ের ৮২ শতাংশই এসেছে তৈরি পোশাক থেকে। আলোচ্য সময়ে মোট তিন হাজার ৪২৫ কোটি ৭২ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে আরএমজি, হিমায়িত খাদ্য এবং পাট ও পাটজাত, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এ চারটি খাত থেকে রপ্তানি আয় এসেছে তিন হাজার ৭১ কোটি চার লাখ ডলার। বাদবাকি পণ্যের অবদান মাত্র ১০ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
পণ্য রপ্তানির গন্তব্যও খুব অল্প। এজন্য পণ্য বহুমুখীকরণের পাশাপাশি ভৌগলিক বহুমুখীকরণও প্রয়োজন। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মত দেশেই মোট রপ্তানির ৮০ ভাগ রপ্তানি হয়। এসব দেশের বাইরে অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, চিলি, চীন, ভারত, জাপান, কোরিয়া, মেক্সিকো, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে শিল্পমালিকরা। সরকারি সহায়তায় এসব নতুন বাজার খুঁজে পাওয়া গেলেও নানা জটিলতা রয়ে গেছে। ফলে অনেকক্ষেত্রে প্রতিযোগী দেশগুলো বেশি সুবিধা পেতে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করে বাজার দখল করছে।
রপ্তানি বহুমুখীকরণ বিষয়ে ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মাফরুহা সুলতানা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের সম্ভাবনা অনেক। এ সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে পণ্যের বহুমুখীকরণ করতে ইপিবি বিভিন্ন ধরণের উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন রোডম্যাপে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, ওষুধ এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানির জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা হচ্ছে। এক্ষেত্রে কি কি সমস্যা আছে, সেগুলো খুঁজে বের করে এর সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগানোর জন্য কাজ চলছে।
ইত্তেফাক/আরএ