তবু থামছে না বিমানে সোনা চোরাচালান

 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানে ত্রুটি ধরা পড়ার পরও বাংলাদেশ বিমানের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের ঘুম ভাঙছেই না। এখনো প্রতিনিয়ত বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট থেকে সোনার বার উদ্ধার হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশে ফ্লাইট পরিচালনা করছে বহু আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স। সেসব ফ্লাইট থেকে কোনো সোনার বার এখন উদ্ধার হয় না। সর্বশেষ গত শনিবার লন্ডন থেকে দুবাই হয়ে সিলেট ওসমানী বিমান বন্দরে অবতরণ করে বাংলাদেশ বিমানের বোয়িং ৭৭৭ ‘অরুন আলো’ নামের ফ্লাইটটি। এই ফ্লাইট তল্লাশি করে অবৈধ ১৬টি সোনার বার উদ্ধার হয়েছে। বাথরুমের মধ্যে পরিত্যক্ত অবস্থায় এই বারগুলো উদ্ধার করে কাস্টমসের শুল্ক ও গোয়েন্দা বিভাগ।
 
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমান নিয়ে এতবড় ঘটনার পরও বাংলাদেশ বিমানের কর্মকর্তারা সতর্ক হননি। কারণ যেভাবে সোনার বার আনা হচ্ছে তাতে বিমানের কেউ না কেউ জড়িত না হলে এই বারগুলো আনা সম্ভব নয়। সোনার বার উদ্ধারের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটিও একই ধরনের মতামত দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যেখানে সোনার বারগুলো রাখা হয় সেখানে বিমানের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ ছাড়া কেউ ওই নাটগুলো খুলতে পারে না। ফলে ওই সোনা চোরাচালানের সঙ্গে ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের কেউ না কেউ জড়িত। বিশ্লেষকরা বলছেন, বারবার কেন বাংলাদেশ বিমানেই সোনার বারগুলো ধরা পড়ে। এর কোনো জবাব নেই।
 
সর্বশেষ গত শনিবার লন্ডন থেকে দুবাই হয়ে সিলেট ওসমানী বিমান বন্দরে অবতরণ করে বিজি ০৫২ ফ্লাইট। সেখানে পাওয়া যায় বারগুলো। ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি রাঙা প্রভাত নামের বিজি ০৪৮ বোয়িং ৭৭৭ এয়ারবাসটি থেকে ৬২ কেজি চোরাই সোনা উদ্ধার করেছিল কাস্টমসের শুল্ক, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। এই বিমানেই হাঙ্গেরি যাচ্ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সোনা উদ্ধারের পর বিমানটিকে জব্দ করে কাস্টমস। ওই দিনই বিমানটি জিম্মায় নেন বিমান পরিচালনা পর্ষদের এক কর্মকর্তা।
 
কাস্টমসের শুল্ক, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মঈনুল খান ইত্তেফাককে বলেন, ‘সোনা উদ্ধারের পর আমরা তদন্ত করে রিপোর্টও দিয়েছি। প্রত্যেকটি ফ্লাইটেই সতর্ক নজর রাখছে আমাদের কর্মকর্তারা।’ 
 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি রাঙা প্রভাত নামের বোয়িং এয়ারবাসটি দুবাই থেকে প্রথমে চট্টগ্রামে যায়। সেখান থেকে ঢাকায় আসে। বিমানটি ল্যান্ডিংয়ের পর খবর পেয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান ড. নজিবুর রহমান এবং কাস্টমসের শুল্ক, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মঈনুল খান বিমান বন্দরে যান। তাদের উপস্থিতিতেই বিমানটিতে তল্লাশি চালিয়ে ইঞ্জিনের পাশের সিলিংয়ের মধ্যে ৬২ কেজি চোরাই সোনা পাওয়া যায়।
 
এ ছাড়া ভিআইপি ও ভিভিআইপিদের বহনকারী আরো তিনটি বিমান থেকে কাস্টমসের শুল্ক, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর সোনার বার উদ্ধার করেছে। গত বছরের ১৪ জানুয়ারি দুবাই থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকা আসা বিজি ০৪৬ এয়ারবাসের সিটের নিচে থেকে ১৪ কেজি চোরাই সোনার বার উদ্ধার করা হয়। এর আগে ২০১৪ সালের ২৪ এপ্রিল একই রুটের বিজি ০৫২ এয়ারবাস থেকে ১০৫ কেজি সোনার বার উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় বিমানের আনিস উদ্দিন ভুঁইয়া ও এয়ারক্রাফট মেকানিক এসিস্টেন্ট মাসুদ উদ্দিনকে গ্রেফতার করে কাস্টমসের শুল্ক, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের কর্মকর্তারা। এরও আগে ২০১৩ সালের ২৪ জুলাই কাঠমুন্ডু থেকে ঢাকায় আসা বিজি ৭০২ এয়ারবাস থেকে ১২৪ কেজি চোরাই সোনার বার উদ্ধার করা হয়েছিল।
 
প্রতিটি বিমান থেকেই চোরাই সোনার বার উদ্ধারের ঘটনায় পৃথক তদন্ত কমিটি হয়েছে। প্রতিটি কমিটিই শুল্ক, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর, সিভিল এভিয়েশন ও বাংলাদেশ বিমানের সমন্বয়ে গঠন করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোও কমিটিতে ছিল। কমিটি নির্দিষ্ট সময়ে রিপোর্টও দিয়েছে। প্রতিবেদনগুলো থেকে দেখা গেছে, তদন্ত কমিটি তাদের রিপোর্টে কিছু সুপারিশের পাশাপাশি অধিকতর তদন্তের জন্যও বলেছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এতকিছুর পরও প্রতিনিয়ত উদ্ধার হচ্ছে অবৈধ সোনার বার।