গণমানুষের মুখপত্র ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ ৬৪ বছরে পা দিল আজ ২৪ ডিসেম্বর, শনিবার। এ এক দীর্ঘ পথ পরিক্রমা। আমাদের প্রাণের এই বাংলাদেশের জন্মেরও আগে সেই স্বাধিকার আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং রক্তের দামে কেনা সেই দেশের উন্নয়নের পথযাত্রা - প্রতিটি পদক্ষেপ ইত্তেফাক গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। আমরা দাবি না করলেও সাধারণ্যে এমন কথা চালু রয়েছে– দৈনিক ইত্তেফাক ও পূর্ব পাকিস্তান থেকে বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সামাজিক যে পথযাত্রা– সেই পথে সমান্তরালভাবে ইত্তেফাকও নিজের যাত্রা অব্যাহত রেখেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দৈনিক ইত্তেফাক বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করে চলেছে। যে কোনো ক্রান্তিকালে দেশের মানুষের সামনে দিকনির্দেশনামূলক সংবাদ পরিবেশন করে চলেছে। সেই কঠিন পথচলায় দৈনিক ইত্তেফাকের পাশে সবসময় যারা ছিলেন এবং এখনো আছেন তারা আমাদের অগণিত পাঠক। দেশবাসীর অকুণ্ঠ সমর্থন, সীমাহীন ভালোবাসাই ছিল দৈনিক ইত্তেফাকের সুদীর্ঘ পথচলার একমাত্র শক্তি ও সাহস। আজকের শুভ মূহূর্তে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা, শুভেচ্ছা।
ইত্তেফাক সত্য ও দেশের প্রতি অবিচল সবসময়। মুক্তিযুদ্ধ দৈনিক ইত্তেফাকের নিরন্তর প্রেরণার উত্স। আজকের শুভক্ষণে তাই দৈনিক ইত্তেফাক গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের শহীদদের। মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। যাঁদের ত্যাগ, পরামর্শ ও ভালোবাসায় দৈনিক ইত্তেফাক কয়েক প্রজন্ম পেরিয়ে এসেছে তাদের আজ আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। দৈনিক ইত্তেফাক তাই আজ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও নির্ভীক সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে। এঁদের সীমাহীন প্রেরণা, ভালোবাসা ও ত্যাগের বিনিময়ে দৈনিক ইত্তেফাক এই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসার শক্তি পেয়েছে। মূলত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মানিক মিয়া ও দৈনিক ইত্তেফাক এই ত্রয়ী এক হয়ে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের সর্বোচ্চ সীমা স্পর্শ করেছিল। তারই পথ ধরে মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে দৈনিক ইত্তেফাক এক অসামান্য ভূমিকা পালন করেছিল। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে আপসহীনভাবে সত্য প্রকাশ করে গেছে। একসময় তদানীন্তন পাকিস্তান সরকারের সামরিক শাসক দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়। সে সময়ে তত্কালীন পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে আপস করলে মানিক মিয়া ইত্তেফাক প্রকাশনা অব্যাহত রাখতে পারতেন। কিন্তু তিনি এবং তার চেতনায় উদ্বুদ্ধ সাংবাদিকগণ জনমানুষের সংবাদপত্রের প্রতি যে বিশ্বাস তার সঙ্গে আপস করেননি। তিন বছর পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ রেখেছিলেন। পত্রিকার সাংবাদিকরাও অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করেছিলেন। কিন্তু কেউ-ই মাথা নত করেননি। ১৯৬৬ সালের ৬ নভেম্বর আওয়ামী লীগ ৬ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দাবি করে। ‘দৈনিক মর্নিং নিউজ’, ‘দৈনিক পাকিস্তান’ ও ‘দৈনিক আজাদ’ ৬ দফার বিরোধিতা করে। দৈনিক ইত্তেফাক ৬ দফার পক্ষে অবস্থান শুধু নয়, অন্যতম প্রচারকের ভূমিকা গ্রহণ করে। ১৬ জুন ১৯৬৬ ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া গ্রেফতার হন ও পরদিন পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়। নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেসও বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রায় দশ মাস পর ১৯৬৭ সালের ২৯ মার্চ মানিক মিয়া মুক্তি পান। এ সময় দৈনিক ইত্তেফাক প্রকাশ করার জন্য সম্পাদকের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু সম্পাদক সাফ জানিয়ে দেন- ‘ইত্তেফাক যদি তার ঐতিহ্য অনুসরণ করে প্রকাশিত হতে না পারে তবে তিনি সে ইত্তেফাক প্রকাশে আগ্রহী নন।’ অবশেষে প্রেস মুক্ত হয়। ১০ ফেব্রুয়ারি ইত্তেফাক পুনর্জন্ম লাভ করে। মানিক মিয়া আদর্শের প্রশ্নে প্রত্যেক সামরিক জান্তা ও স্বৈরাচারী শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নির্ভীক সাংবাদিকতার যে উদাহরণ তিনি সৃষ্টি করে গেছেন তা ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। বাঙালির অধিকার রক্ষায় পত্রিকার সম্পাদক-প্রকাশক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে বারবার কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়; হুমকি ও লোভ দেখিয়েও লক্ষ্যচ্যুত করতে পারেনি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের এদেশীয় দোসররা। শুধু তাই নয়, মহান মুক্তিযুদ্ধে ২৫ মার্চ কালরাতে দৈনিক ইত্তেফাক অফিস ভবনসমেত পুড়িয়ে দেয়া হয়। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা দৈনিক ইত্তেফাককে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল, কিন্তু মানুষের ভালোবাসায় বারবার প্রবল প্রতাপে ফিরে এসেছে দৈনিক ইত্তেফাক।
১৯৭১ সালের পয়লা মার্চের সামরিক আইনের বিধান অগ্রাহ্য করেই ইত্তেফাক সে সময়কার অসহযোগ আন্দোলনের খবর নিয়মিতভাবে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে। অথচ সরকার আপত্তিকর সংবাদ পরিবেশনের দায়ে ১০ বছর কারাদণ্ডের বিধান করেছিল। কিন্তু দৈনিক ইত্তেফাক তার কোনো তোয়াক্কা করেনি। মানুষের মুক্তির প্রশ্নে, স্বাধীনতার প্রশ্নে অস্তিত্ব বিলীনের ঝুঁকি অগ্রাহ্য করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি নিরবচ্ছিন্নভাবে সমর্থন যুগিয়ে যায়। ইত্তেফাকের এই ভূমিকা উপমহাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে প্রদিপ্ত গৌরবের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
মুক্তিযুদ্ধের পরে নতুন বাস্তবতায় দৈনিক ইত্তেফাক নতুন আঙ্গিকে প্রকাশিত হচ্ছে। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে ইত্তেফাক জনগণের চাওয়া-পাওয়াকে গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করেছে। মানুষের সুখ-দুঃখের ভাগিদার হয়েছে। দেশ গড়ার নতুন সংগ্রামে নেমেছে। রাজনৈতিক মুখপত্রের বলয় থেকে বেরিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে তার সাংবাদিকতা অগ্রসর হচ্ছে এখন। সময়ের দাবি মেটাতে ইত্তেফাক এর বিন্যাসে অনেকে পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু সত্য, ন্যায়, গণতন্ত্র এবং বাংলাদেশের মানুষের অধিকারের প্রশ্নে ইত্তেফাকের অবস্থান প্রতিষ্ঠার পর থেকে কখনো বদলায়নি। দৈনিক ইত্তেফাক কখনোই বাণিজ্যের জন্য, কিংবা কাউকে সমাজে হেয় করবার জন্য সংবাদ পরিবেশন করেনি। ইত্তেফাক কখনোই রাগ-বিদ্বেষ চরিতার্থ করতে সংবাদ পরিবেশন করেনি। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ইত্তেফাকের সেই পুরনো আদর্শই এখনও একমাত্র সম্পাদকীয় নীতি। আর তা হলো, নিরপেক্ষ এবং নির্ভীক সাংবাদিকতার ধারা অনুসরণ এবং গণমানুষের মনে স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখা, সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের সঙ্গে আপস না করা এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে অবিচল থাকা।
১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের বিরোধী সংগঠন হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। সে বছরই নবগঠিত সংগঠনের মুখপত্ররূপে ‘সাপ্তাহিক ইত্তেফাক’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন পত্রিকার আনুষ্ঠানিক সম্পাদক। কলকাতা প্রত্যাগত তফাজ্জল হোসেন সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকার সাথে যুক্ত হন এবং ১৯৫১ সালের ১৪ আগস্ট থেকে এই পত্রিকার পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মুসলিম লীগের ক্ষমতায় থাকাকালে দেশের বিরাজমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে এবং স্বাধীনতা-উত্তর প্রথম সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে তফাজ্জল হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর উত্সাহ, অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতায় ও মওলানা ভাসানীর পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর ইত্তেফাককে দৈনিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশ করেন। তফাজ্জল হোসেন এই পত্রিকার সম্পাদক। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে তত্কালীন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকারের যে ভরাডুবি হয় এর পেছনে ছিল দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার শক্তিশালী রিপোর্ট ও মানিক মিয়ার ক্ষুরধার লেখনি।
মূলত: ষাটের দশক থেকে আইয়ুবের মার্শাল ‘ল’ ও মৌলিক গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ইত্তেফাক কঠোর অবস্থান নেয়। ১৯৬১ সালে জেনারেল আইয়ুব খান সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করার জন্য ‘প্রেস এন্ড পাবলিকেশন্স অ্যাক্ট’ জারি করেন। এ বছর পূর্ব পাকিস্তানে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী উদযাপনের উদ্যোগ নেয়া হলে সরকার, প্রশাসন ও তাদের সমর্থনকারী বুদ্ধিজীবীদের একাংশ বিরোধিতা করে, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ছিলেন উদযাপন কমিটির সদস্য এবং দৈনিক ইত্তেফাক সে সময় রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী উদযাপনে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে।
১৯৬৯ সালে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া আকস্মিকভাবে ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুর পর ইত্তেফাক প্রকাশনা অব্যাহত থাকে এবং বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ও স্বাধীনতা আন্দোলনে সরাসরি সমর্থন দেয়, সম্পাদকীয় সচিত্র প্রতিবেদন, ফিচার প্রকাশপূর্বক নানাভাবে সমর্থন দেয়, গড়ে ওঠে জনমত। বিশেষ করে ১৯৭০ সালের নির্বাচন, আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে পাকিস্তানিদের অনীহা ও ষড়যন্ত্র এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ ও সর্বাত্মক অসহযোগের আহবান থেকে ২৫ মার্চ কালরাতে আক্রান্ত হবার পূর্ব পর্যন্ত দৈনিক ইত্তেফাক অনন্যসাধারণ ও গৌরবময় ভূমিকা পালন করে।
আজ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দুপুর বারোটায় দৈনিক ইত্তেফাকের কাওরান বাজার কার্যালয়ে মিলন মেলার আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া, সারাদেশে বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের আয়োজন করা হয়েছে।