সেলিনা হায়াত্ আইভী ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নারায়গঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে টানা দ্বিতীয়বারের মত মেয়র পদে জয় পান। গত ৫ জানুয়ারি গণভবনে শপথ গ্রহণের পর ৯ জানুয়ারি মেয়র হিসেবে আবার দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন। চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলার রায় ঘোষণার প্রাক্কালে রবিবার নগর ভবনে নিজ কার্যালয়ে কথা বলেছেন ইত্তেফাকের সঙ্গে।
তিনি বলেন, নগরবাসীর প্রয়োজনীয় সেবা প্রদানের মাধ্যমে একটি পরিবেশবান্ধব, পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যসম্মত, নিরাপদ ও দারিদ্র্যমুক্ত পরিকল্পিত নগর গড়ে তুলতে চাই। উন্নয়নের পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জের হারানো ঐতিহ্য ও মর্যাদাও ফেরাতে চাই। নেগেটিভ থেকে ‘পজেটিভ নারায়ণগঞ্জ’ উপহার দেয়াই আমার অন্যতম লক্ষ্য।
‘হারানো মর্যাদা’র বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করবেন? এরকম একটি প্রশ্নের জবাবে আইভী বলেন, নারায়ণগঞ্জের কথা শুনলে অনেকে ভয় পান, অনেকে এটিকে সন্ত্রাসের জনপথ হিসেবে চেনেন। এই শহর সম্পর্কে একটা নেতিবাচক ধারণা। অথচ এই নারায়ণগঞ্জের মানুষ অত্যন্ত সহজ-সরল ও অতিথি পরায়ণ। রাজনীতি, সংস্কৃতি, খেলাধুলাসহ এই নগরের অনেক ঐতিহ্য রয়েছে। এখানেই তো আদমজী জুট মিল ছিল, যেখানে হাজার হাজার শ্রমিকের কলরব ছিল। বন্দরে বিভিন্ন জেলার মানুষ এসে সম্প্রীতির বন্ধনে কাজ করতেন। কিন্তু এই নারায়ণগঞ্জকে বিগত কয়েক বছর ধরে মানুষ চেনেন ভিন্নভাবে। ‘নারায়ণগঞ্জ’ নাম শুনলেই সবাই যেন আঁতকে উঠেন। খুন, গুম, রাহাজানি, চাঁদাবাজি আর সন্ত্রাসের অনেকগুলো ঘটনার কারণে এই বদনাম। ২০০৩ সালে দেশে ফিরে দেখি মানুষ ভয়ে কথা পর্যন্ত বলে না, সবার মধ্যে জড়তা, কেমন জানি ভীতি-শঙ্কার একটা নগর, সবাই নীরব। আমি এগুলোর বিরুদ্ধে দাঁড়ালাম, শ্লোগান ধরলাম, জনগণ পাশে এসে দাঁড়ালেন, সোত্সাহে সমর্থন জানালেন।
একজন নারী হয়েও এভাবে প্রতিবাদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আপনার শক্তি-সাহসের উত্স কি ছিল? জানতে চাইলে সেলিনা হায়াত্ আইভী বলেন, মানুষের সাহসটা আসলে অনেক বড় ব্যাপার। যখন কারও ভেতরে মানুষের জন্য নিঃস্বার্থ ভালোবাসা থাকে, মানুষের জন্য কিছু করার প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকে, যেখানে নিজের ব্যক্তিগত কোনো চাওয়া-পাওয়া থাকে না তখনই একজন মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এমন শক্তি-সাহস অর্জন করে। আমার বাবা-মায়ের কাছ থেকে এমনটি শিখেছি।
পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন মিলিয়ে আপনি আগে টানা প্রায় ১৩ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। আগামী পাঁচ বছরের জন্য আবার দায়িত্ব পালন শুরু করলেন। দেশের পৌরসভার প্রথম নারী চেয়ারম্যান আপনি, কোনো সিটি করপোরেশনেরও প্রথম নারী মেয়র আপনি, দলীয় মনোনয়ন ও প্রতীকে হওয়া প্রথম সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত মেয়র হওয়ার গৌরবও আপনার ভাণ্ডারে। এমনকি পরপর এতবার নির্বাচিত হওয়ার দৃষ্টান্তও বিরল। এতগুলো রেকর্ড অর্জন এবং দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নারী হওয়ার কারণে আপনি কি কখনও প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন?
এ প্রশ্নের জবাবে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে ও কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ রাখার পর জোরে নিঃশ্বাস ছেড়ে আইভী বলেন, প্রথমদিকে কিছু সমস্যা হতো। ২০০৩ সালে যখন পৌরসভার প্রথম নারী চেয়ারম্যান হই তখন অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে কাজ করতে হয়েছে। কাউন্সিলরদের অনাস্থার মুখে পড়তে হয়েছে। অনেক চড়াই-উত্রাই পার করেছি। বিগত পাঁচটি বছর নিজ দলের ভেতরেও আমাকে অসম্ভব যুদ্ধ করতে হয়েছে। শুধু যে ব্যক্তিগতভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছি তা নয়, উন্নয়নের ক্ষেত্রে পদে পদে নানাভাবে বাধা দেয়া হয়েছে। নারী হওয়ার কারণে কত অপবাদ দেয়া হয়েছে! অপমান, অপদস্থ করা হলো! কতবার আমার কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়েছে! দুদকের প্রতীকি কোর্ট বসিয়ে আমাকে ফাঁসি দেয়া হয়েছিল! এত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও কখনও পিছ পা হইনি, এতটুকু দমে যাইনি, কোনো অপবাদ-বাধা আমাকে আটকাতে পারেনি। শুধু জনগণের এমন সমর্থন আর ভালোবাসার কারণে নারী হয়েও নিজেকে কখনও কিছুতে কম বা বেশি মনে হয়নি, নিজেকে সবসময় একজন মানুষ হিসেবেই দেখেছি। যার কারণে এখন পরিস্থিতি অনেকটা পাল্টেছে।
২২ ডিসেম্বরের নির্বাচনে এমন বিজয়ের ব্যাপারে আপনার নিজের বিশ্বাস কতটা ছিল? এ ব্যাপারে প্রতিদ্বন্দ্বীকে প্রায় লাখ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে বিজয়ী আইভীর বক্তব্য, জয়ের ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না। আমি হেরে যাব, একথাটি একবারের জন্যও আমার মনে আসেনি। এত কাজ করেছি, জনগণের উপর আমার আস্থা ছিল, সেই কারণে জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস ছিল।
দীর্ঘ ১৩ বছরে নারায়ণগঞ্জ নগরীর উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য কি কি কাজ করেছেন? এর জবাবে নাসিক মেয়র বলেন, রাস্তাঘাট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন সবার কাছে দৃশ্যমান। বিশেষ করে, বন্দর এলাকায় রাস্তাসহ অবকাঠামো উন্নয়ন আমার চরম শত্রুও অস্বীকার করতে পারবে না। যেই বন্দরে একসময় সন্ধ্যার পর মানুষ যাতায়াত করতে ভয় পেত, সেই বন্দর এখন আলোকিত, বলতে পারেন নতুন চেহারায় নতুন সাজে সেজেছে বন্দর। পঞ্চবটিতে একটি পার্ক করেছি। আরো পার্ক দরকার, নাসিকের তিনটি অঞ্চলে অন্তত দুটি করে ছয়টি পার্ক করা প্রয়োজন। ১০ তলা নগর ভবনের কাজ দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে, বেজমেন্টের কাজ শেষ, একটি আধুনিক নগর ভবন হবে। আলী আহমদ চুনকা পাঠাগারে বড় অডিটোরিয়াম নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে। মামলার কারণে এটা নির্মাণে এত সময় লাগছে। ছয়শ হকারকে পুনর্বাসন করেছি, তারপরেও ফুটপাথগুলো এখনও হকারদের দখলে, এখানে সুবিধাভোগী ৩-৪টি পক্ষের ইন্ধন আছে। সরকারি অর্থ ও এডিবি’র সহযোগিতায় তিনটি হাসপাতাল করেছি।
নগরীর উন্নয়নে এবারের মেয়াদে আপনার পরিকল্পনা কি জানতে চাইলে সেলিনা হায়াত্ আইভী বলেন- নারায়ণগঞ্জকে একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও আধুনিক নগর হিসেবে গড়ে তুলতে ইতিমধ্যে ‘রূপকল্প-২০৩০’ প্রণয়ন করেছি। এরমধ্যে ৫, ১০ ও ২০ বছর মেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনা রয়েছে।
আগামী পাঁচবছর মেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, এবার সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছি উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিতকল্পে এবং তিলোত্তমা নগরী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য শীতলক্ষ্যা নদীর উপর পাঁচশ কোটি টাকা ব্যয়ে সেতু নির্মাণের পরিকল্পনাকে। এজন্য এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ে সহসাই প্রকল্প জমা দেব। এরপর সেটি একনেকে পাঠানো হবে। এই সেতুটি হলে নগরের পূর্বের সঙ্গে পশ্চিমের সংযোগ স্থাপিত হবে। আমরা সবুজ নারায়ণগঞ্জ গড়তে চাই, এজন্য প্রচুর গাছ লাগানোর কর্মসূচি নেয়া হচ্ছে। নগরে ছয় একরের মত জলাশয় আছে, এসব জলাশয়সহ সকল খাল-পুকুর সংরক্ষণ করবোই। এজন্য যেখানে অবৈধ স্থাপনা আছে তা উচ্ছেদ করা হবে। বাচ্চাদের খেলার জন্য ওইরকম মাঠ নেই, সেজন্য জেলা প্রশাসকের কাছে তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা মাঠগুলো ব্যবহারের অনুমতি চাইবে সিটি করপোরেশন।
২০১১ সালে মেয়র হওয়ার পর আপনি বলেছিলেন, নগরীর সমন্বিত উন্নয়নের জন্য ‘নগর সরকার’ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। আপনি কি এখনও সেই প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন? এ প্রশ্নের জবাবে মেয়র আইভী বলেন, নগর সরকার ব্যবস্থা খুব জরুরি। প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, তিনি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আরো জোরদার করতে চান। জোরদার করতে হলে নগর সরকারের বিষয়ে এখনই চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। এটা রাতারাতি হবে না, তবে আমার দৃঢ়বিশ্বাস- একদিন এই ব্যবস্থা চালু হতেই হবে। ২২ ডিসেম্বরের নাসিক নির্বাচন নিয়ে তেমন কোনো বিতর্ক সৃষ্টি হয়নি। জাতীয় রাজনীতি ও সংসদ নির্বাচনে এর ইতিবাচক কোনো প্রভাব পড়তে পারে বলে আপনি মনে করেন? এরকম প্রশ্নের জবাবে হাসিমুখে আইভী বলেন, আমি অত্যন্ত ভাগ্যবান যে- ২০০৩, ২০১১ ও ২০১৬ সালে নারায়ণগঞ্জে আমি যে তিনটি নির্বাচন করেছি প্রত্যেকটি নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে নির্বাচন হলেও এনিয়ে আগ্রহ ছিল সারাদেশে। আমি তো মনে করি ২২ ডিসেম্বরের নির্বাচনটি একটা মডেল নির্বাচন।
মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আপনি নারায়ণগঞ্জে দলকে কতটা সময় দিতে পারবেন? আইভীর জবাব, মেয়র হিসেবে কাজ করতে-করতে দলের সবার সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয়। একটা সংযোগ থাকে। প্রতিদিন একেবারে পার্টি অফিসে গিয়ে বসে দল করতে হবে, সেটির দরকার হবে না। যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী, নৌকাকে ভালোবাসেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সম্মান করেন-তাদের সবার সঙ্গেই আমার সম্পর্ক আছে।
জাতীয় রাজনীতি অর্থাত্ আগামীতে সংসদ নির্বাচনে আসার কোনো চিন্তা-ভাবনা করছেন কি-না। জানতে চাইলে আইভী অনেকটা বিষ্ময়ের হাসি দিয়ে বলেন, ‘না ভাই, এই মুহূর্তে সেরকম কোনো চিন্তা নেই।
ইত্তেফাক/এএন