সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে জলমহাল দখলকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের মধ্যে সংঘর্ষ ও বন্দুকযুদ্ধে ৩ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
মঙ্গলবার ১১টার দিকে উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের ঘোড়ামারা সাতপাকিয়ায় স্থানীয়ভাবে পরিচিতি জারলিয়া জলমহালের দখল নিয়ে উপজেলা যুবলীগ নেতা একরার হোসেনের সমর্থকদের সঙ্গে ইজারাদার পক্ষের ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা মাসুক চৌধুরী ও এয়াহিয়া চৌধুরীর সমর্থকদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের ঘটনায় ৩ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। দুই পক্ষের বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় হাতিয়া গ্রামের ছানাউল্লাহ’র ছেলে তাজুল ইসলাম (৩৫) ও আকিলনগর গ্রামের ইসহাক মিয়ার ছেলে শাহারুল (২৮) ঘটনাস্থলে নিহত হন। আহত অবস্থায় উজ্জল (২৫) নামে এক ব্যক্তিকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে বিকাল পৌনে ৪টার দিকে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আহত ১৫ জনের মধ্যে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আল আমিন (২৪), সুনাফর (২৭)ও মালেক মিয়াকে (৩০) সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, জারলিয়া জলমহালটি নিয়ে গত দুবছর যাবৎ বৈধতা ও অবৈধতা নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রথমে জলমহালটি যুবলীগ নেতা একরার উন্নয়ন স্কীমের মাধ্যমে মন্ত্রণালয় থেকে ইজারা বন্দোবস্ত আনেন। পরে কুলঞ্জ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা মাসুক চৌধুরী রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এডভোকেট সোহেল আহমদ, সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ রায় এবং দিরাই পৌর মেয়র উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোশারফ মিয়া মিলে জলমহালের অংশীদারিত্ব পান। এটি তারা দক্ষিণ নাগেরগাঁও মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নামে ইজারাদার লাভ করেন। এর বিরুদ্ধে একরার হোসেন জেলা প্রশাসক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দেন। পরে জেলা প্রশাসক জলামহালে মৎস শিকার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার ঘোষণা দেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা আরো জানায়, মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে একরার হোসেনের নেতৃত্বে প্রায় দেড়শ’ থেকে দুইশ’ সমর্থক দেশীয় বন্দুক, পাইপগান, সড়কি ও লঠি নিয়ে জারলিয়া জলমহাল দখল করতে যায়। এসময় গেলে ইজারাদার দক্ষিণ নাগেরগাঁও মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ধনঞ্জয় দাসের লোকজন জলমহালের খোলাঘরে অবস্থান করছিলেন। দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ চলাকালে বন্দুক দিয়ে পাল্টাপাল্টি গুলি ছোড়ে।
দিরাই থানার ওসি আবদুল জলিল বলেন, জলমহালের দখল নিয়ে স্থানীয় একরার হোসেন ও মাসুক চৌধুরীর মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে মঙ্গলবার ভোর থেকে এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। মঙ্গলবার দুপুরে একপক্ষের লোকজন ওই জলমহালে মাছ ধরতে গেলে দুই দল সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষের মধ্যে তাজুল ইসলাম ঘটনাস্থলেই মারা যান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। দশজনকে আহত অবস্থায় সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে হলে যাওয়ার পথে শাহারুল এবং হাসপাতালে ভর্তির পর উজ্জ্বলের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোন পক্ষ মামলা করেনি। লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
এই সংঘর্ষের অভিযোগের ব্যাপারে ইজারাদার ধনঞ্জয় দাসের পক্ষে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা মাসুক চৌধুরী জানান, সরকারকে যথাযথ খাজনা প্রদান করে দখলপ্রাপ্ত হয়ে এই জলমহালটি তারা ভোগ দখল করে আসছে। সকালে একরার হোসেনের লোকজন বন্দুক ও পাইপগানে সজ্জ্বিত হয়ে জলমহালে হামলা চালিয়ে তিন মৎসজীবীকে হত্যা করেছে। এর আগেও তারা বহুবার জলমহালে জোর করে প্রবেশ করে মাছ লুট করেছে।
অপরদিকে, যুবলীগ নেতা একরার হোসেন বলেন, ইজারাদারদের কাছ থেকে তিনি ৬ বছরের জন্য সাব-লিজ নিয়ে জলমহালটি ভোগ দখল করে আসছেন। মঙ্গলবার সকালে প্রতিপক্ষের লোকজন তার মৎসজীবীদের ওপর হামলা চালিয়ে ৩ জনকে হত্যা করেছে।
সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার হারুন রশিদ বলেন, সংঘর্ষের সময় দুই পক্ষ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছে। নিহত তিনজনের শরীরেই গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। জলমহাল এলাকায় পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেখানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
ইত্তেফাক/এএম/এমআই