বগুড়ার শিবগঞ্জে যৌতুকলোভী মাদকাসক্ত স্বামীর রামদা’র কোপে ক্ষত বিক্ষত হয়ে এখন হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন এক গৃহবধূ। হাসপাতালে নেয়ার ৬ দিন পর জ্ঞান ফিরলেও আশংকামুক্ত হননি মনিকা শারমিন হাসি (২৮) নামের নির্মম নির্যাতনের শিকার ঐ গৃহবধূ।
ঘটনার সময় তার শশুর দাঁড়িয়ে থাকলেও বাঁধা না দিয়ে উল্টো ছেলেকে সহায়তা করেছেন এমন অভিযোগও উঠেছে। কিন্তু নির্যাতিতার বাবা ঘটনার পর মামলা দায়ের করলেও পুলিশ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ঐ গৃহবধূর স্বামী, শশুর কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি।
এদিকে গৃহবধূ মণিকা শারমিন হাসিকে কুপিয়ে হত্যা চেষ্টাকারীকে অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবিতে বগুড়া শহরে মানববন্ধন করেছে সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম। মঙ্গলবার দুপুরে শহরের সাতমাথায় এই কর্মসূচী পালন করে সংগঠনটি।
এলাকাবাসী জানায়, বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক ইউনিয়নের পরিহার গ্রামের মধ্যবিত্ত কৃষক হান্নান চৌধুরীর একমাত্র মেয়ে মনিকা প্রায় ৮ বছর আগে ভালবেসে বিয়ে করেন প্রতিবেশী আবু নাসের ইলিয়াস রিপনকে।
রিপন- হাসির পরিবারে ছেলে ফাহাদের বয়স ৭ বছর এবং একমাত্র মেয়ে ৪ বছর বয়সী ফারিয়া মেহজাবিন ।
হাসির বাবা হান্নান চৌধুরী জানান, বিয়ের প্রায় ৩ বছর পর হঠাৎকরেই বদলে যায় রিপন। পরে মেয়ের কাছে জানতে পারেন, মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে সে। নিয়মিত ইয়াবা সেবন করে। নেশার কারণে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া দোকানপাট, অটোরিকশা বিক্রি করেছে। সেইসঙ্গে স্ত্রীর স্বর্ণালংকারও বন্ধকী রেখেছে নেশার টাকা যোগাড় করতে। হাসি বাঁধা দিলে তার ওপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন।
এরআগেও ২০১৪ সালে নেশার টাকা যোগাড় করতে যৌতুকের জন্য স্ত্রী হাসির শরীরে গরম পানি ঢেলে দিয়েছিল রিপন। সে সময় হাসির শরীর ঝলসে যায়। থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা হলে গ্রেফতার হয় রিপন। প্রায় ৪ মাস কারাজীবনও ভোগ করে। পরে স্থানীয় কিচক ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান শাহজাহান চৌধুরীর কাছে মুচলেকা দিয়ে নিজের ভুল স্বীকার করে স্ত্রী হাসিকে ঘরে ফিরিয়ে নেন। দুটি শিশুসন্তানদের ভবিষ্যৎ ভাবনায় সবাই বিষয়টি মেনে নিয়েছিল।
কিন্তু কিছুদিন অতিবাহিত না হতেই রিপন আবার তার পুরনো চেহারায় ফেরে। নেশাসক্ত রিপন আবারও শুরু করে নির্যাতন । ১০ লাখ টাকা যৌতুকের দাবিতে মারপিট করতে থাকে গৃহবধূ হাসিকে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ৩১ জানুয়ারি গভীর রাতে নিজ বাড়িতে বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে শিশু সন্তানদের সামনে রিপন রামদা দিয়ে নির্মমভাবে কুপিয়ে স্ত্রী হাসির মাথা, মুখ, গলা, বুক, পেটসহ ১৬টি স্থানে ক্ষতবিক্ষত করে। এমতাবস্থায় হাসি অচেতন হয়ে পড়ে যায়।
প্রায় আড়াই ঘণ্টা এভাবে ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকলেও রিপনের পরিবারের সদস্যরা তাঁকে উদ্ধারে এগিয়ে আসেনি। ঘটনার সময় রিপনের চাচাতো ভাই মিল্টন ও সোহেল দেয়াল টপকে বাড়িতে প্রবেশ করলে রিপন রামদা নিয়ে পালিয়ে যায়।
পরে তাদের মাধ্যমে ঘটনা জানতে পেরে মেয়ে হাসিকে উদ্ধার করে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে প্রায় আট ঘণ্টার অস্ত্রোপচারের পর তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখেন চিকিৎসকরা। ৬ দিন পর রবিবার জ্ঞান ফেরে হাসি’র।
শজিমেক হাসপাতালের নিউরো সার্জন সুশান্ত পাল জানান, হাসির অবস্থা এখনও সংকটাপন্ন। মাথা ও গলার ক্ষত মারাত্মক। তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
শজিমেক হাসপাতালের ওষুধ বিশেষজ্ঞ ডা. আরাফাত বলেন, ‘প্রচুর রক্তক্ষরণের কারণে হাসির শরীরে রক্ত দিতে হয়েছে। তার শরীরে মাঝেমধ্যেই খিঁচুনি হচ্ছে। চেতনা ফিরলেও সে কথা বলা বা ইশারা দিতে পারছে না। তার উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। তবে এ মুহূর্তে তাকে কোথাও স্থানান্তর করার মতো শারীরিক সক্ষমতা নেই। বিশেষ ব্যবস্থাপনা ছাড়া অন্য কোথাও স্থানান্তর করা নিরাপদ নয়। ’
হাসি’র বাবা হান্নান চৌধুরী জানান, ঘটনার পরদিন থানায় মামলা দায়ের করা হলেও শিবগঞ্জ থানা পুলিশ অজ্ঞাত কারণে আসামি ধরছে না। এদিকে রিপন অজ্ঞাত স্থান থেকে মামলা তুলে নেবার জন্য ফোনে হুমকি দিচ্ছে।
এদিকে মামলা তদন্তকারী শিবগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবুল কালাম বলেন, ‘ঘটনার তদন্ত চলছে। হাসি’র স্বামীসহ যারাই এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত বা সহযোগিতা করেছে সকলকে আইনের আওতায় নেয়া হবে। প্রধান আসামি রিপনসহ তার পরিবারের অন্য সদস্যরা পলাতক রয়েছে। তাদেরকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে ।
এদিকে গৃহবধূ হাসিকে নির্যাতনের প্রতিবাদে সোমবার বেলা ১১ টায় শহরের সাতমাথায় সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম এর আয়োজনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মহিলা ফোরাম এর বগুড়া জেলা কমিটির সভাপতি দিলরুবা নূরীর সভাপতিত্বে কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন, জেলা বাসদের আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম পল্টু, জেলা ছাত্রফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক মাসুকুর রহমান, রাধা রানী বর্মন প্রমুখ। পাষণ্ড পিতার বিচার চেয়েছে তার সন্তানরাও ।
বক্তারা বলেন, সারাদেশে নারী নির্যাতন চলছে। একইভাবে মণিকা শারমিন হাসিকে পাশবিক কায়দায় নির্যাতন করা হয়েছে। যা কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না। মানববন্ধন থেকে অবিলম্বে হাসির নির্যাতনকারীকে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।
ইত্তেফাক/এএন