ইন্দোনেশিয়ার তিমি কী বলিতে চাহে?

প্রায় দশ মিটার লম্বা একটি তিমি। উহার পেটে হাট মেলিয়া বসিয়াছিল প্রায় হাজারখানেক প্লাস্টিকের পণ্য। বেচারা তিমি সেইসকল বাহারি পণ্যের হাট সহ্য করিতে পারে নাই। অকালে অক্কা পাইয়া গত মঙ্গলবার ভাসিয়া উঠিয়াছে ইন্দোনেশিয়ার উপকূলে। তিমিটির পেটে সব মিলাইয়া সহস্রাধিক পণ্য তথা বর্জ্যের মধ্যে রহিয়াছে—১১৫টি প্লাস্টিকের ব্যাগ, ২৫টি প্লাস্টিক বোতল, প্রচুর প্লাস্টিকের কাপ, দুইটি প্লাস্টিকের জুতা। একটি নাইলনের বস্তাও ছিল তিমিটির পেটে। আর এই সবগুলির ওজন ছিল প্রায় ছয় কেজি! কয়েক মাস পূর্বে থাইল্যান্ডে একটি মৃত তিমির পেটে প্লাস্টিকের ৮০টি ব্যাগ পাওয়া যায়। পাকস্থলিতে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিকই ছিল তিমিটির মৃত্যুর কারণ।

ইহা এখন সকলেই জানেন যে, প্লাস্টিক অপচ্য। ইহার আয়ুষ্কাল কমপক্ষে ৫০০ বত্সর। কেবল তিমি নহে, প্লাস্টিকের ছোট ছোট অংশ প্রতিদিন আমাদের পেটেও ঢুকিতেছে। তাহা আমরা জানিতেও পারিতেছি না। ৫ মিলিমিটারের চাইতে ছোট প্লাস্টিকের অংশকে বলা হয় মাইক্রোপ্লাস্টিক। ড্রেনের পানিতে মিশিয়া যাওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিক পৌঁছাইয়া যাইতেছে সমুদ্রে। আর সমুদ্রের পানিতে মিশ্রিত এই প্লাস্টিক ঢুকিয়া যাইতেছে জলজ উদ্ভিদে। মাছ খাইতেছে সেই উদ্ভিদ। ফলে তাহাদের শরীরেও পৌঁছাইয়া যাইতেছে বিপুল পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক। ২০১৭ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়াছে, ইন্দোনেশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার বাজারের ২৫ শতাংশ মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের অংশ রহিয়াছে। ২০১৭ সালে ইউরোপ, আমেরিকা এবং চীনের একটি যৌথ গবেষণায় জানা যায়, কেবল মাছ নহে, সমুদ্র উপকূল হইতে সংগৃহীত লবণের মধ্যেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যাইতেছে। প্রতি বত্সর প্রায় সোয়া এক কোটি প্লাস্টিক আবর্জনা সমুদ্রে গিয়া মিশিতেছে। ফলে উপকূলবর্তী লবণেও মিশিয়া যাইতেছে তাহার অংশবিশেষ। সমুদ্রে মাইক্রোপ্লাস্টিক মিশিবার আরেকটি বড় উত্স হইল সিন্থেটিক জামাকাপড়। দেখা গিয়াছে, সিন্থেটিক জামাকাপড়ে বিপুল পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকে। কাপড় ধৌত করিবার সময় সেই প্লাস্টিক জামা হইতে বাহির হইয়া ড্রেনের পানিতে গিয়া মিশিয়া থাকে। পরীক্ষায় দেখা গিয়াছে, ৬ কিলোগ্রাম সিন্থেটিক জামা ধৌত করিলে উহা হইতে ৭ লক্ষাধিক প্লাস্টিক ফাইবার নির্গত হয়। ড্রেনের পানির মাধ্যমে তাহা গিয়া পৌঁছায় সমুদ্রে। বস্তুত, সমুদ্রের পানিতে প্লাস্টিকের মোট পরিমাণের এক তৃতীয়াংশই জামা কাপড়ের মাইক্রোপ্লাস্টিক। আর সকল ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক ঢুকিয়া পড়িতেছে খাদ্যচক্রে। সেই খাদ্যচক্রের মাধ্যমে তাহা প্রবেশ করিতেছে মানুষের শরীরেও।

প্লাস্টিক মানবশরীরের কত ধরনের ক্ষতি করিতে পারে, তাহা লইয়া নিরন্তর গবেষণা চলিতেছে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, প্লাস্টিক আধুনিক সভ্যতার দারুণ এক আবিষ্কার। ইহার বিবিধ ব্যবহার মানুষের জীবনকে সহজ করিয়াছে অনেক। কিন্তু সেই সহজ জীবনই প্লাস্টিকের চক্রে পড়িয়া নিদারুণ হইয়া উঠিতেছে ক্রমশ। প্লাস্টিকের ভয়াবহ চক্র হইতে মানবজাতির মুক্তি সহজে মিলিবে না, কিন্তু তাহার জন্য নিশ্চেষ্ট হইয়া বসিয়া থাকাও যায় না। ইন্দোনেশিয়ার তিমি মরিয়া যেন বলিতে চাহিল—আমাদের ভবিষ্যত্ও তাহার চাইতে অধিক ভালো নহে।