গত ১০ নভেম্বর বাংলা একাডেমিতে তিন দিনব্যাপী লিট ফেস্টের পর্দা পড়লো। সমপ্রতি রাজধানীতে ‘ফেস্ট কালচারের’ ব্যাপক চল হয়েছে। লিট ফেস্ট, ট্রান্সলেশন ফেস্ট, ফোক ফেস্ট, সুফি ফেস্ট ইত্যাদি কত ধরনেরই না ফেস্টের দেখা মিলছে। সঙ্গতকারণেই প্রশ্ন আসে, এসব ফেস্ট আমাদের দেশজ সংস্কৃতিতে কতটা প্রভাব বিস্তার করছে? নিশ্চয়ই শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি সাগরের ঢেউয়ের মত প্রবহমান। নানামুখি স্রোতের মত দেশি-বিদেশি সংস্কৃতির ধারা একই মোহনায় মিশে একে আরো গতিশীল করছে। ‘মিলিবে আর মিলাবে’ এই নীতিই এখানে মুখ্য। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন, পুলিত্জার বিজয়ী লেখক এডাম জনসন, ক্যান্সার সারভাইভাল চিত্রাভিনেত্রী মনীষা কৈরালাসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের আলোকিত মানুষেরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ফেস্টে অংশগ্রহণের জন্য ঢাকায় এসেছেন। শুধু অভিজাত পাড়ায়ই নয়, উন্মুক্ত সেশনে সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন। শত প্রশ্নের উত্তর দিয়ে উন্মুখ দর্শক-শ্রোতাকে সমৃদ্ধ করেছেন।
এই উচ্চতার লেখক, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিরা সাধারণ পাঠক-শ্রোতার কাছে নক্ষত্রের মতই অধরা। তাই তাদের শুধু বাণীই নয়, তাদের পরশও ছিল অনেকের কাছে স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতই আনন্দঘন। ট্রান্সলেশন ফেস্ট এসেছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন আবেদন নিয়ে। অনেকটাই উপেক্ষিত বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে মর্যাদার সঙ্গে উপস্থাপিত করবার অনুপ্রেরণা নিয়ে। খোদ রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলিকে ইংরেজিতে ‘ট্রান্সলেশন’ করতে গিয়ে যেসব সমস্যা সেই সময় দেখা দিয়েছিল, আবার তারই ধারাবাহিকতায় বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখাকে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে গিয়ে আজ যে সব সমস্যার সম্মুখীন আমাদের হতে হচ্ছে, তা থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে ট্রান্সলেশন ফেস্টে।
গত তিন বছর ধরে আর্মি স্টেডিয়ামে উপস্থিত প্রায় পঞ্চাশ হাজার এবং অনলাইনে প্রায় কয়েক লক্ষাধিক দর্শক সরাসরি ফোক ফেস্টিভাল অনুষ্ঠান উপভোগ করে আসছেন। সেখানে পাশ্চাত্যের ফোকগানের পাশাপাশি মিসর, মালি বা সাহারা অঞ্চলের ফোকগান তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যমণ্ডিত বাদ্যযন্ত্র ও পোশাক পরিধান করে পরিবেশন করা হয়। একই মঞ্চ থেকে পরিবেশিত হয় বাংলার জারিসারি-মুর্শিদী গানও ।
২০১৫ সালে আগারগাঁওস্থ সামরিক জাদুঘর প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় সুফি ফেস্ট। সংগীতের উপাসনার মাধ্যমে পরমাত্মার সন্ধান করেন দেশি-বিদেশি সুফি সাধকেরা। আমাদের বিনোদনহীন নগরবাসী কিছুটা হলেও সপরিবারে মুক্ত বাতাসের স্বাদ নেন।
এসব ফেস্ট রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ছাড়া শুধু কর্পোরেট পুঁজি থেকে লগ্নিকৃত অর্থে সম্পন্ন করা হয়েছে। কর্পোরেট সংস্কৃতির অন্যতম উদ্দেশ্যই হচ্ছে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ। তাই এই ফেস্টগুলোর পিছনে বাণিজ্যিকীকরণের উদ্দেশ্য যে নেই সেটি নিশ্চিত করে বলা দুষ্কর। আর তেমনটি যদি হয়েও থাকে তবু তা মন্দ নয়। তবে দেখতে হবে শিল্পের বাণিজ্যিকীকরণ করতে গিয়ে শিল্পের মূল সুরটিই যেন হারিয়ে না যায়। আমরা পরদেশি শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির বিরুদ্ধবাদী নই। তবে ফেস্টের অর্জন-বিসর্জন যাই হোক না কেন, লক্ষ রাখা দরকার রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, ইলিয়াস, ছফারাই যেন আমাদের মননকে ধারণ করেন। লালন, হাসন, মরমি, মুর্শিদী, দেহতত্ত্ব-এর সুরেই যেন আমাদের চেতনার মূলসুর ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়।
n লেখক : উপ-অধিনায়ক, আর্মড ফোর্সেস ফুড এন্ড ড্রাগস ল্যাবরেটরি