অটিজমঃ শিশুর বিকাশজনিত সমস্যা, প্রয়োজন প্রাথমিক অবস্থায় সনাক্তকরণ

আজ ১০ম বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস। প্রতি বছর সরকারের সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়-এই দিনটিকে পালন করে আসছে। এবারে এ দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো- “স্বকীয়তা ও আত্মপ্রত্যয়য়ের পথে”।

অটিজম শিশুর বিকাশজনিত একটি সমস্যা। ১৯৪৩ সালে আমেরিকার মনোরোগ বিশেষজ্ঞ লিও ক্যানার সর্বপ্রথম মনস্তাত্ত্বিক সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে রোগটি শনাক্ত করে অটিজম শব্দটি ব্যবহার করেন।

শিশুর জন্মের প্রথম তিন বছরের মধ্যে এর লক্ষণ প্রকাশ পায়। রবার্ট এল বার্কার উল্লেখ করেছেন, অটিজম এমন একটি বিকাশজনিত সমস্যা এতে ব্যক্তির মধ্যে বাইরের জগত সম্পর্কে সামান্য আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়।

অটিস্টিক শিশুর অন্যান্য বৈশিষ্ট্যঃ
অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ ও আচরণের সীমাবদ্ধতা হচ্ছে অটিস্টিক শিশুর প্রধান বৈশিষ্ট্য। এছাড়া কয়েকটি বৈশিষ্ট্য এখানে উল্লেখ করা হলো-
১.    নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয় না।
২.    কোন খেলনা বা আনন্দদায়ক বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট হয় না।
৩.    কারো আদরও পেতে চায় না।
৪.    বিশেষ আচরণ বার বার করতে চায়।
৫.    তারা রুটিন মেনে চলতে চায়।

অটিজমের কারণ:
অটিজমের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ এখন পর্যন্ত নির্ণয় করা যায় নি। তবে কোনো কোনো বিজ্ঞানী মনে করেন, অটিজমের পিছনে দু’টি কারণ রয়েছে-
১. জিনগত সমস্যা ২. পরিবেশগত সমস্যা।

অটিজমে আক্রান্ত শিশুর ডিএনএ জিনে কপি নাম্বার অফ ভ্যারিয়্যান্ট (সিএনভি)নামক ত্রুটি বহন করে। পরিবেশের বিষাক্ত উপকরণ স্নায়ুকোষ ধ্বংস করে। বিষাক্ত গর্ভের শিশু এবং শিশুর বৃদ্ধির প্রাথমিক পর্যায়ের মস্তিস্কের স্নায়ুকোষকে ধ্বংস করে। যেসব রাসায়নিক দ্রব্য অটিজমের জন্য দায়ী তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, মার্কারি ও লেড।

অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, এটি একটি নিউরোলজিক্যাল বা মস্তিস্কের সমস্যা। কারণ কখনও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় মস্তিস্কের কিছু অসুবিধা লক্ষ্য করা যায়। যেমন-
১.    মস্তিস্কের কোনোরূপ গঠনগত ত্রুটি
২.    মস্তিস্কের অস্বাভাবিক বৈদ্যুতিক ক্রিয়া
৩.    মস্তিস্কের নিউরোকেমিকেলের অসামঞ্জস্যতা
৪.    অন্তক্ষরা গ্রন্থির হরমোন নিঃসরণে অসামঞ্জস্যতা

অটিজম- বাংলাদেশের অবস্থা:
বিশেষজ্ঞের মতে, বাংলাদেশে অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। সমাজ সেবা অধিদপ্তরের প্রতিবন্ধী সনাক্তকরণ জরিপে (২০১৩-২০১৬) বাংলাদেশে অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা ৪১৩২৯ জন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অন্য একটি জরিপে বলা হয়েছে ঢাকা শহরে অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা গ্রাম অঞ্চলের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে-বাংলাদেশে প্রায় ১শতাংশ শিশু বা ব্যক্তি অটিজমের বৈশিষ্ট্য বহন করছে।

অটিজম শিশু চিকিৎসার উপায়:
গবেষণায় দেখা গেছে যে, শৈশবে হস্তক্ষেপ করা গেলে অটিজম নিয়ে জন্ম নেয়া শিশু প্রাপ্তবয়সে অনেকটাই স্বাভাবিক হতে পারে। শৈশবে হস্তক্ষেপ বলতে বুঝায়, জন্মের ১৮ মাস থেকে ৩৬ মাস বয়সের মধ্যে অটিজম শনাক্তকরণ ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে শিক্ষা পরিকল্পনার মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শিশুকে সঠিক চিকিৎসা দেওয়া।

অটিস্টিক শিশুর প্রধান চিকিৎসা নিওরোবিহেভিওরাল থেরাপি, অতিরিক্ত আচরণগত সমস্যা ও শারীরিক সমস্যার জন্যে মেডিকেল চিকিৎসা এবং বিশেষ স্কুলে শিক্ষা দেওয়া। দেখা গেছে স্বল্প ও মধ্যম মাত্রার অটিজম প্রাথমিক অবস্থায় ধরা গেলে এবং সঠিকভাবে পরিচর্যা ও শিক্ষা পেলে রোগের উপসর্গ অনেকাংশ কমানো যেতে পারে।


লেখক: সহযোগী অধ্যাপক
শিশু নিউরোলজী
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/নূহু