কাওছার হোসেন, সাজ্জাদ হোসেন ওরফে সাদ্দাম, শাহাদাত্ হোসেন ও আনোয়ার হোসেন। সবাই জানে তারা ব্যবসায়ী। কি ধরনের ব্যবসায় জড়িত তা অনেকেই জানত না। একটি মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর জানা গেল, তাদের ব্যবসার নেপথ্য কাহিনি। তাদের ভদ্রবেশী মুখোশের আড়ালে জানা গেল, তারা চোর। কাভার্ডভ্যান থেকে রপ্তানিপণ্য চুরি সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য। চট্টগ্রাম সদরঘাট থানা পুলিশ গত ১৬ নভেম্বর তাদেরকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে শাহাদাত্ হোসেন ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। পাশাপাশি একই সময় চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ একই অভিযোগে গ্রেফতার করে কাশেম ও রাশেদ নামে আর দুই চোরকে।
কাভার্ডভ্যান থেকে রপ্তানিপণ্য চুরি সংক্রান্ত একাধিক মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সহকারী কমিশনার (পশ্চিম) মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে রপ্তানি পণ্য চুরির সঙ্গে জড়িত রয়েছে একাধিক চক্র। এরমধ্যে একটি চক্রেই রয়েছে ৩০ জন। যারা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সক্রিয়। যারা ট্রাক-কাভার্ডভ্যান থেকে মাঝপথেই সরিয়ে নিচ্ছে মালামাল। তিনি বলেন, এভাবে পণ্য চুরির ঘটনায় শিল্পখাত যেমন আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন, তেমনি রফতানির চালান না পেয়ে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে বিদেশি ক্রেতারা। তিনি বলেন, গ্রেফতারকৃত কাশেম ও রাশেদ সিন্ডিকেটের অন্যতম। তাদের দেওয়া তথ্যমতে এ সিন্ডিকেটের অপর সদস্যদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।
মোবাইলের সূত্র ধরে গ্রেফতার : চট্টগ্রাম সদরঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নেজাম উদ্দিন জানান, চট্টগ্রাম মহানগরীর সদর ঘাট এলাকার বাংলাবাজার এপারেলস গার্মেন্টস গত ৫ সেপ্টেম্বর ২২৪ কার্টনে ৬ হাজার ৭২০টি জ্যাকেট কাভার্ডভ্যানে করে পাঠায় সীতাকুণ্ডু ভানুবাজারের পোর্টলিংক ডিপোতে। পোর্টলিংক যথারীতি কার্টনগুলো গ্লোবাল নামের শিপিং এজেন্টকে বুঝিয়ে দেয়। ওই এজেন্ট জাপানের ক্যানভেরা এজেন্টের মাধ্যমে জাপানের ইন্ডিপ কোম্পানির কাছে পৌঁছে দেয়। পরবর্তীতে ওই কোম্পানি (ইন্ডিপ) কার্টন খুলে দেখে নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে কার্টনে ২ হাজার ৭৩৪টি জ্যাকেট কম। তবে একটি কার্টনে পাওয়া যায় একটি মোবাইল ফোন (বাংলালিংকের সিম লাগানো বাংলাদেশের ওয়ালটন কোম্পানির একটি মোবাইল ফোন)।
এ অবস্থায় জাপানের কোম্পানি বিষয়টি এপারেলস গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষকে ই-মেলে অবহিত করে। বাংলাবাজার এপারেলস গার্মেন্টসের বাণিজ্যিক কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে গত ১১ নভেম্বর সদরঘাট থানায় মামলা দায়ের করে। ওসি জানান, গ্রেফতারকৃতরা স্বীকার করেছে, কার্টন থেকে জ্যাকেট চুরির সময় শার্টের পকেট থেকে অসাবধানতা বশত তাদের মোবাইল ফোনটি কার্টনে পড়ে যায়।
ওই ফোনের সূত্র ধরেই ১৭ নভেম্বর দিনভর হাটহাজারীর থানার ফতেয়াবাদ এলাকায় অভিযান চালিয়ে কাওছার হোসেন, সাজ্জাদ হোসেন ওরফে সাদ্দাম, শাহাদাত্ হোসেন ও আনোয়ার হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়। ওসি আরও জানান, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে শাহাদাত জানায়, গত তিন মাসে ৮ থেকে ১০টি কাভার্ডভ্যান রপ্তানিযোগ্য গার্মেন্টস পণ্য চুরি করেছে।
কাভার্ডভ্যানের সিলগালা দরজা বা কার্টন খুলে পণ্য চুরির ব্যাপারে শাহাদাত জানিয়েছেন, কাশেম ও ইকবালের নিয়ন্ত্রণে ২০ থেকে ৩০ জন শ্রমিক রয়েছে। পণ্যভর্তি কাভার্ডভ্যানের দরজার সিলগালা অবিকল রেখে নাট ঘুরিয়ে পুরো দরজা খুলে ফেলা হয়। কয়েকজন শ্রমিক রয়েছে যারা ব্লেড দিয়ে কার্টনের টেপ নিখুঁতভাবে কেটে প্রতিটি কার্টন থেকে ৮ থেতে থেকে ১০টি পণ্য বের করে নেয়। বাংলাবাজার এপারেলস গার্মেন্টসের জ্যাকেটগুলোও একইভাবে চুরি বের করেছিল।
রপ্তানি পণ্য গায়েবের ঘটনায় আরও দুজন গ্রেফতার :ঢাকা থেকে কাভার্ডভ্যানে চট্টগ্রাম বন্দরে যাওয়া রপ্তানিযোগ্য ২৪ হাজার ৬৪০ সেট তৈরি পোশাকের মধ্যে সাড়ে ৪ হাজার সেট পোশাক গায়েব হবার ঘটনায় গত ১৮ নভেম্বর কাশেম ও রাশেদকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ।
এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সহকারী কমিশনার (পশ্চিম) মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম জানান, গত ১১ নভেম্বর বিদেশে রপ্তানির জন্য একটি কাভার্ডভ্যানে করে ঢাকার সাভার থেকে নিট কম্পোজিট নামের একটি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের ২৪ হাজার ৬৪০ সেট তৈরি পোশাক চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্দেশ্যে আসে। এ সময় বন্দরে নিয়ে আসা কাপড়ের মধ্যে ৪ হাজার ৫৬৮ পিস কাপড় চুরি হয়। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত কোম্পানি গত ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর থানায় মামলা করে। পরে মামলার তদন্ত ডিবিতে ন্যস্ত হয়। ডিবি পুলিশ বন্দর এলাকায় অভিযান চালিয়ে কাশেম ও রাশেদকে গ্রেফতার করে। তাদের দেওয়া তথ্যমতে উদ্ধার করা হয় চুরি হওয়া পোশাক।