পেটুক প্রাণী যত

পৃথিবীর সকল প্রাণীকে বাঁচার জন্য নিয়মিত খাদ্য গ্রহণ করতে হয়। তবে বেশিরভাগ প্রাণীই তার চাহিদা অনুযায়ী খাবার গ্রহণ করে থাকে। শরীরের আকার আকৃতি, স্বভাব, কাজের পরিধির ওপর নির্ভর করে প্রাণীর খাবারের পরিমাণ। ২শ টন ওজনের একটি তিমি কিংবা বিশালাকৃতির হাতি যে পরিমাণ খাবার খায় ছোট প্রাণীরা সেই তুলনায় খুবই সামান্য খাবার গ্রহণ করে। তবে পৃথিবীতে এমন কিছু প্রাণী রয়েছে যারা কিনা নিজের শরীরের তুলনায় কয়েকগুণ খাবার গ্রহণ করে। তাই এদের পেটুক বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের অরিগন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক, বন্যপ্রাণী বিষয়ক বাস্তুবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ ড্যান রোবির মতে, এমন কিছু পাখি রয়েছে যারা নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে অনেক বেশি পরিমাণ খাবার খায়। বিশেষ করে সমুদ্র এবং মরুভূমির পথ পাড়ি দেয়ার আগে এ পাখিদের প্রয়োজনীয় শক্তির জন্য অনেক বেশি পরিমাণ খেতে হয়। বিজ্ঞানীরা পাখিদের এ ধরনের খাওয়াকে ‘অস্বাভাবিক খাওয়ার চাহিদা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিশেষ করে পরিযায়ী পাখিরা যখন এক দেশ কিংবা এক ভূ-খণ্ড থেকে অন্যত্র যায় তখন তাদের মধ্যে এ ধরনের প্রবণতা অনেক বেশি দেখা যায়। বেশি খাওয়া পাখিদের মধ্যে পৃথিবীর সব থেকে পুচকে পাখি হামিংবার্ড অন্যতম। এরা অতি দ্রুত শক্তি ক্ষয় করে ফেলতে পারে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের তথ্য মতে, একটি হামিংবার্ডের টিকে থাকার জন্য প্রতিদিন যে পরিমাণ খাবার খেতে হয় তা ৩শ বার্গারের শক্তির সমান। ওড়ার সময় প্রতি মিনিটে হামিংবার্ডের ১২০০ বারের বেশি বার হূদস্পন্দন হয়। এ কারণে এদের অনেক বেশি শক্তির প্রয়োজন হয়। এদের বিপাক ক্রিয়াও খুব দ্রুত সম্পন্ন হয়।  

আমেরিকা এবং কানাডার কিছু অঞ্চলে ‘ব্ল্যাকপোল ওয়াব্ল্যায়ার’ নামের একটি পাখি দেখতে পাওয়া যায়। শরতে এ পাখিরা উত্তর আমেরিকা থেকে দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন উপকূলে পাড়ি জমায়। এ সফরে তাদের সমুদ্রের উপর দিয়ে একটানা আড়াই হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। গায়কী পাখিদের মধ্যে একটানা পথ পাড়ি দেয়ার ক্ষেত্রে ব্ল্যাকপোল ওয়ারব্ল্যায়ার রেকর্ড পরিমাণ পথ পাড়ি দেয়। একবার যাত্রা শুরু করলে তাদের পথিমধ্যে খাবারের জন্য কোথাও বিরতি নেয়ার সুযোগ নেই। কারণ নিচে শুধু পানি আর পানি। এ কারণে শরীরে অনেক বেশি পরিমাণ চর্বি সঞ্চয় করে রাখতে হয়; যা কিনা প্রয়োজনের সময় কাজে লাগাতে পারে। ৮০ ঘণ্টার এ দীর্ঘ যাত্রায় নিজের শরীরের তুলনায় দ্বিগুণ পরিমাণ চর্বি জমিয়ে রাখে এ পাখিরা। এমনই আরেকটি পাখি বার-টেইলড গডউইটস, এরা একটানা ১০ দিন উড়ে আলাস্কা থেকে নিউজিল্যান্ডে পৌঁছায়। সুমেরু অঞ্চলের প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে টিকে থাকার জন্য ক্ষুদে পাখি চিকাডিদের শরীরের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণ খেতে হয়। ব্রিটেনের একটি পাখি পিগমিশ্রিউর ওজন এক আউন্সের থেকেও কম। অথচ তারা তাদের শরীরের দেড়গুণ পরিমাণ খাবার খেয়ে থাকে। মূলত দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়া কিংবা ঠান্ডার মধ্যে নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্যই এদের অনেক বেশি শক্তি সঞ্চয় করে রাখতে হয়। এ কারণে এ ধরনের কিছু পাখিরা পেটুক প্রকৃতির হয়ে থাকে। চোখের সামনে খাবার থাকলেই এরা খেতে থাকে।

ক্ষুদে পাখিদের বাইরে এমন কিছু প্রাণী রয়েছে যারা কিনা তাদের বড়সড় শরীরের কারণেই বেশি খাবার গ্রহণ করে থাকে। এ যেমন নীল তিমির কথাই বলা যাক। ২শ টন ওজনের এক একটি তিমিকে টিকে থাকার জন্য প্রতিদিন অন্তত চার টন খাবার খেতে হয়। বাঘেরও অনেক বেশি খাবার দরকার হয়, এক বসায় এরা ১৭ কেজি থেকে এক মণেরও বেশি খাবার খেতে পারে। কিন্তু এরা সব সময় খায় না। তাই নিয়মিত শিকারও করে না বাঘ। না খেয়ে এরা একটানা দুই সপ্তাহ কাটিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে সিংহ কোনো বড় প্রাণী শিকার করলেও অনেক বেশি খায় না, পুরো দলের সাথে ভাগ করে খায়। অজগরও অনেক বেশি পরিমাণ খেতে পারে। একটি পূর্ণাঙ্গ বার্মিজ অজগর মাসে একবার খেয়ে থাকে। তবে যখন খায় তখন অনেক বেশি পরিমাণ খেয়ে থাকে। একটা বার্মিজ অজগর একাই একটি হায়েনা খেয়ে সাবাড় করে দিতে পারে।— ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক