মাটি ঘুঁড়লেই উঠে আসে শত শত পলিথিন ব্যাগ। চট্টগ্রামের পরিবেশে ব্যবহার-নিষিদ্ধ পলিথিনের এই ভয়াল থাবায় প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপন্ন হয়ে উঠেছে। নিষিদ্ধ পলিব্যাগের ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পেয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। সরকার ২০০১ সালে ৫৫ মাইক্রোনের নিচে পাতলা পলিথিন উত্পাদন এবং এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছিল। তবে আইনের ও শর্তের ফাঁক-ফোকরে এই ধরনের পরিবেশ বিধ্বংসী পলিথিনের উত্পাদন ও ব্যবহার বন্ধ তো হয়ইনি, বরং আগের চেয়ে ব্যাপক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য জনসাধারণের অসচেতনতাকে পুরোমাত্রায় দায়ী করলেন বিভিন্ন পরিবেশবিদ। তারা বলছেন, শুধু চট্টগ্রাম মহানগরীতেই প্রতিদিন হাটবাজারসহ দৈনন্দিন কাজে প্রায় ১ কোটি নিষিদ্ধ পলিব্যাগ ব্যবহূত হচ্ছে। আর এই সব পলিব্যাগ প্রতিদিন নিক্ষিপ্ত হচ্ছে চট্টগ্রামের নদী-নালা-জলাশয়, মাটি-পাহাড়-বনভূমি এবং সমুদ্র মোহনায়। নিষিদ্ধ পলিব্যাগের জঞ্জাল থেকে চট্টগ্রামকে বাঁচাতে নগর কর্তৃপক্ষ বা সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত দুর্বল পর্যায়ে রয়ে গেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, এই পলির জঞ্জাল থেকে চট্টগ্রামের মাটির উর্বরতা কমছে। কর্ণফুলী নদীর মাছ ও জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার যে কথা বিশেষজ্ঞরা বলছেন তার পেছনেও সিংহভাগ দায়ী এই পলিথিন। একই বিপর্যয়ের আশংকা করা হচ্ছে বঙ্গোপসাগরেও।
এদিকে, নিষিদ্ধ পলিথিন উচ্ছেদে গত দেড় দশকে ব্যাপক অভিযান পরিচালিত হয়েছে। রেডিও-টেলিভিশন, সংবাদপত্রসহ গণমাধ্যমে ক্ষতিকর পলিথিন নিয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা হয়েছে। তারপরও জন-অসচেতনতায় চট্টগ্রামজুড়ে পলিথিনের ব্যাপক ব্যবহারকে দুঃখজনক আখ্যায়িত করেছেন স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠন পিপলস ভয়েসের সভাপতি শরিফ চৌহান।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সালমা মমতাজ ইত্তেফাককে বলেন, পলিথিন ও ক্ষতিকর প্লাস্টিক জাতীয় বর্জ্যগুলো আলাদা করে রিসাইক্লিং করার ব্যবস্থা নেই বলে সেগুলো প্রতিদিনই চট্টগ্রামের প্রকৃতি-পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে ভয়াবহভাবে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, মাটির স্বাভাবিক গুণাগুণ।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামসুজ্জোহা ইত্তেফাককে বলেন, সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ঘরে ঘরে গিয়ে গ্রিন বিনের মাধ্যমে বর্জ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। কিন্তু প্রতিটি পরিবারকে বিন দেওয়া হয়েছে ১টি করে। অথচ দেওয়া উচিত্ ছিল ২টি করে। কারণ ১টিতে তরল বর্জ্য এবং অপরটিতে কঠিন বর্জ্য ফেলার নিয়ম। দেখা যাচ্ছে পলিথিন, বোতল-প্লাস্টিক ইত্যাদি কঠিন বর্জ্যকে তরল বর্জ্যের সঙ্গে মিশিয়ে সংগ্রহ করা হয়। ফেলা হয় করপোরেশন নির্দিষ্ট ডাম্পিং স্পটে বা ভাগাড়ে। সেখান থেকে আশেপাশের বস্তিবাসী পলিথিন ও প্লাস্টিক সংগ্রহ করে বিক্রি করছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে। তারা সেগুলো গলিয়ে বানাচ্ছে নানা পণ্য। পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের একজন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যবহার বন্ধে তারা প্রায়শঃই অভিযান চালাচ্ছেন। সম্প্রতি ট্রাকে করে ঢাকা থেকে কক্সবাজারে নিয়ে যাওয়ার সময় পটিয়ায় তারা ৫ টন পলিথিন আটক করেছেন । তিনি বলেন, রপ্তানির জন্য এবং পণ্যে ব্যবহারের জন্য এক ধরনের মুদ্রিত পলিথিন উত্পাদনের সুযোগ সরকার থেকে দেওয়া হয়। কিন্তু এই সুযোগকে ব্যবহার করে এক শ্রেণির পলিথিন উত্পাদনকারীরা ৫৫ মাইক্রোনের নিচে পলিব্যাগের জন্য পাতলা পলিথিন ব্যাপকভাবে উত্পাদন করছে, যা আইনত নিষিদ্ধ এবং দণ্ডনীয়।