বুড়িগঙ্গা নদী থেকে উদ্ধার হওয়া যশোরের বিএনপি নেতা আবু বকর আবুর মৃত্যু কিভাবে হয়েছে তা নিয়ে এখনো ধুম্র্রজালের মধ্যে রয়েছে পুলিশ। আবু বকর পানিতে পড়ে গিয়ে মারা গেছেন, না কি তাকে হত্যা করে লাশ নদীর পানিতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছে পুলিশ। তবে বিজয়নগরে মেট্রোপলিটন হোটেলের সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজের দৃশ্য নিয়ে পুলিশ সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছে।
গত রবিবার রাত ৮টা ৩৪ মিনিটে বকর হোটেল থেকে বেরিয়ে যান। লিফট থেকে তার সঙ্গে দুই ব্যক্তি নামেন। এদের মধ্যে একজনের পরনে ধূসর রঙের গেঞ্জি ও চেক লুঙ্গি ও অপর জনের পরনে জিন্স প্যান্ট ও ধূসর রঙের গেঞ্জি। দ্বিতীয় ব্যক্তির মাথায় উলের টুপি রয়েছে। তারা দুজন আবু বকর চলে যাওয়ার দৃশ্য অবলোকন করে লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে পরস্পর কথা বলতে থাকেন। এ দুব্যক্তি কারা— তা পুলিশ তদন্ত করছে।
গতকাল দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ওসি শাহ জামান বলেন, ‘লাশ উদ্ধারের পর পুলিশের তৈরি করা সুরতহাল রিপোর্টে শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন মেলেনি। লাশের সঙ্গে তার লাগেজ বা মোবাইল ফোনও উদ্ধার হয়নি। তবে তাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছে কি না— সে বিষয়টি ভিসেরা রিপোর্টের মাধ্যমে জানা যাবে। গতকাল পর্যন্ত পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশের কাছে কেউ কোনো অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ দিলে সেই অনুযায়ী ঘটনাটি তদন্ত করা হবে। তদন্ত করে হত্যার আলামত পাওয়া গেলে অপমৃত্যু মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়ে যাবে।’
মিটফোর্ড হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের ময়নাতদন্তকারী চিকিত্সক মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কোনো কথা বলতে চাননি। তিনি বলেন, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়া গেলে তার মৃত্যুর কারণ জানা যাবে। তবে মর্গের অপর একটি সূত্র বলছে, নিহতের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন মেলেনি।
সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নের জন্য আবু বকর আবু গত ১২ নভেম্বর ঢাকায় আসেন। নয়াপল্টন এলাকার মেট্রোপলিটন হোটেলে ছিলেন। সেখান থেকে দলীয় মনোনয়ন ফরম কিনেন ও জমা দেন। ১৮ নভেম্বর রাত ৯টার দিকে তার সঙ্গী মজিদপুর ইউপি মেম্বার সাইফুল ইসলাম ওষুধ কিনে ফিরে এসে তাকে আর রুমে পাননি। রাত পৌনে ৯টার দিকে তার ব্যবহূত মোবাইল ফোন থেকে কেশবপুরে অবস্থানরত তার এক ভাগ্নের মোবাইলে কয়েকবার মিসকল আসে। প্রত্যেকবার ব্যাক কলে শুধু হ্যালো হ্যালো ছাড়া কোনো কথা হয়নি। এরপর ০৯৬৩৮৮৮৮২০২ নম্বর মোবাইল থেকে ওই ভাগ্নের কাছে ফোন দিয়ে দেড় লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। এ জন্য ওই রাতে কয়েকটি বিকাশ নম্বরও সরবরাহ করেন তারা। বিভিন্ন সময় তারা এক লাখ ৭০ হাজার টাকা বিকাশ করলেও আবু বকরকে ছেড়ে দেয়া হয়নি।
১৯ নভেম্বর বুড়িগঙ্গার চর-খেজুরবাগ বেবী সাহেব ডগইয়ার্ড সংলগ্ন পানিতে ভাসমান অবস্থায় একজনের লাশ অজ্ঞাত হিসাবে উদ্ধার করা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ মিটফোর্ড মর্গে পাঠানো হয়। বৃহস্পতিবার রাতে মৃতের আত্মীয়-স্বজনরা মিটফোর্ড মর্গে গিয়ে লাশ শনাক্ত করেন।
যশোর অফিস ও কেশবপুর সংবাদদাতা জানায়, যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ও যশোর জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আবু বকর আবুর (৭০) লাশ উদ্ধারের পর নানা গুঞ্জন শুরু হয়েছে। স্থানীয় বিএনপি নেতারা হত্যাকাণ্ডে সরকারের ‘হাত’ রয়েছে বলে দাবি করেছেন। তবে উপজেলা পর্যায়ে বিএনপির রাজনীতিতে যথেষ্ট সক্রিয় থাকলেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শক্তিশালী প্রার্থী তিনি কখনোই ছিলেন না। আসন্ন নির্বাচনেও যশোর-৬ আসনটি বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও কেশবপুর উপজেলা সভাপতি আবুল হোসেন আজাদের মনোনয়নের বিষয়টি অনেকদিন ধরে নিশ্চিত হয়ে রয়েছে। তারপরও তিনি কেন হত্যার শিকার হলেন- তা নিয়ে দলটির সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বেঁধেছে। এর আগে ২০০৮ সালের ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আবুল হোসেন আজাদ বিএনপির প্রার্থী ছিলেন।
মৃতের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, আবু বকরকে অপহরণ করা হয়েছে জানিয়ে তাদের কাছ থেকে এক লাখ ৭০ হাজার টাকাও আদায় করা হয়েছে। কিন্তু অপহরণকারীরা তাকে মুক্তি দেয়নি। পরিবার অপহরণ দাবি করলেও বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী পাঁচ নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে জানিয়ে বুধবার দলটির পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনে যে তালিকা দেওয়া হয়েছিল, সেখানে আবুর নাম উল্লেখ করা হয়।
শুক্রবার কেশবপুরে নিহতের গ্রামের বাড়ি বাগদহায় নিহতের বাড়িতে গিয়ে বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সাংবাদিকদের কাছে বলেন, সরকারের এজেন্সির লোকেরা আবুকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছে। এই হত্যার মধ্যে দিয়ে দক্ষিণবঙ্গের কাছে সরকার একটি বার্তা দিতে চেয়েছে। তবে হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেন তিনি।
এদিকে, কেশবপুরের উপজেলা বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বিষয়টিও স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনায় রয়েছে। এখানে বিএনপির দুটি অফিস। একটিতে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সদস্য আবুল হোসেন আজাদ এবং অপরটিতে পৌর বিএনপির সভাপতি সাবেক মেয়র আব্দুস সামাদ বিশ্বাস ও নিহত আবু বকর আবু নেতৃত্ব দিতেন। স্থানীয় বিএনপির মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের জের ধরে এ হত্যার ঘটনাও ঘটতে পারে বলে একটি সূত্র ধারণা করছে।
শুক্রবার তার মরদেহ ঢাকা থেকে কেশবপুরে এসে পৌঁছায়। বাদ জুমা কেশবপুর পাবলিক মাঠে তার প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তার গ্রামের বাড়িতে দ্বিতীয় দফা জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. সাবেরুল হক সাবু ছাড়াও খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলার নেতাকর্মী, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও জানাজায় অংশগ্রহণ করেন এবং মৃতের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
আবুর মৃত্যুতে জেলা ও উপজেলা বিএনপি বিভিন্ন শোক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। আবুর মরদেহে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি দলীয় কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন ও নেতাকর্মীরা কালোব্যাজ ধারণ করেছেন।