ফ্ল্যাট ও বাড়ি বিক্রি করবার চেয়ে ঝামেলার কাজ কমই আছে। কিভাবে আইনী ভুল এড়িয়ে চলা যায় তা আইন না জেনে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। আবার সাধারণ মানুষের পক্ষে আইনের ভাষা বোঝাও অত্যন্ত কষ্টকর। যারা কখনো এ্যাক্ট বা কোর্টের রায় পড়ে দেখার নিষ্ফল চেষ্টা করেছেন তারা এর জটিলতা জানেন। তাছাড়া আইনের বাইরে বাস্তব পরিস্থিতি সঠিকভাবে নির্ণয় করবার বিষয়তো আছেই। এতে অনেকেই ধাঁধাঁয় পড়ে যান বা সঠিক পরিকল্পনার অভাবে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেন।
কাজেই, যেকোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মতোই, বাড়ি বা এ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি করতে গেলে অনিশ্চিত ভাবে পদক্ষেপ নেয়া ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিক্রি করতে গেলে কিছু বিষয়ে ধারনা থাকা যেমন জরুরি, একি সঙ্গে বিক্রি করার জন্য সার্বিক পরিকল্পনা তৈরি করে ফেলাও আবশ্যক। প্রতিটি ধাপে কি হবে, আপনি ফ্ল্যাট বিক্রি করতে চাইলে প্রথমে কি করবেন, আত্মীয়-বন্ধুর উপর নির্দ্বিধায় ভরসা করবেন কিনা ইত্যাদি বিষয় যেকোন বিক্রেতাকেই ভাবায়। আমরা এ লেখায় বিক্রির জন্য কি কি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে এবং কিভাবে সুষ্ঠ পরিকল্পনার মাধ্যমে বিক্রয় প্রকৃয়াটি নির্ঝঞ্ঝাট করা যায় তার একটি রূপরেখা প্রদান করবার প্রচেষ্টা করেছি।
কাগজ পত্র ঠিক রাখা : সর্বপ্রথম আপনাকে যে কাজ করতে হবে তা হলো বাড়ি বা ফ্ল্যাটের সব দলিল খুঁজে বের করা। প্রায়শই মানুষ দলিল ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজ তুলে রাখে এবং দীর্ঘদিনের ব্যবধানে সেসব অনেকক্ষেত্রেই খুঁজে পাওয়া যায় না। দলিল পুরনো হোক বা নতুন আপনাকে প্রথমেই তা নিজের আয়ত্ত্বে আনতে হবে।
আইনি প্রতিনিধি নিয়োগ : আপনাকে আইনজীবি নিয়োগ করতেই হবে। অনেকেই তাদের বন্ধু বা কোন মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভর করেন। দেখা যায়, সে ব্যক্তি হয়তো অনেকের জমি-ফ্ল্যাট বিক্রি করে দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো দুর্ঘটনা বা অনাকাঙ্খিত কিছু ঘটলে শেষে উকিল নিয়োগ করতেই হয়। কাজেই এ ধরনের ঝুঁকি না নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
বিরোধ তৈরি হলে করনীয় : আপনি বাড়ি বা ফ্ল্যাট বিক্রি করতে যাচ্ছেন এমন সময় কেউ এর মালিকানা দাবি করে বসলো, এমন ঘটনা কিছুমাত্র বিরল নয়। এটা প্রায়শই ঘটে থাকে যে তাই শুধু না, আদালতে এমন হাজার হাজার মামলা প্রক্রিয়াধিন রয়েছে এবং নতুন মামলা প্রতিনিয়ত আসছে। অনেক সময় জমির দাগ বা সীমা নিয়ে বিরোধ উত্থাপিত হয়। অনেকক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ বানোয়াট দাবি করে প্রকৃত মালিককে হয়রানি করা হয়। অনেক সময় আসলেই ভুল বোঝাবুঝি ঘটতে পারে। যাই ঘটুক না কেন, আপনাকে এর সমাধান করেই বিক্রি করতে হবে।
এ ধরনের সমস্যা সমাধানে পেশাদার ও যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করা উচিৎ। এ ছাড়া আরেকটি বিষয় হলো এমন বিরোধের ক্ষেত্রে আদালতের বাইরে সমঝোতা করে ফেলা অনেক সময় লাভজনক। সেক্ষেত্রেও আপনার নিজের আইনানুগ অধিকার সম্বন্ধে পরিষ্কার জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।
বিরোধ হয়ে গেলে এবং তা সমঝোতার মাধ্যমে মেটানো না গেলে আদালতের দ্বারস্থ হওয়া থেকে বিরত থাকা উচিৎ হবে না। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, অনেকক্ষেত্রেই মিথ্যা দলিল দিয়ে এধরনের ঝামেলা সৃষ্টি করা হয়। এমন হয়ে থাকলে আপনার আইনজীবী সহজেই তা নিরুপণ করতে সক্ষম হবেন। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সকল দলিলের রেকর্ড থাকে এবং দলিল যাচাই করে তা ভুয়া কিনা বের করা সম্ভব। মামলা চালনা করা পরিশ্রমসাধ্য ও কষ্টকর হলেও ভালো আইনজীবী থাকলে সে কষ্ট তেমন থাকে না। সাধারণভাবে মানুষ মনে করে জমি-বাড়ির মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। এ ধারনায় সত্যতা থাকলেও ঢালাওভাবে তা বিশ্বাস করে বসে থাকাটা বোকামি, কারণ অনেক সময়ই বিরোধের ভিত্তি না থাকলে দ্রুত আদালতের রায় পাওয়া যায়।
রিয়েল এস্টেট প্রতিনিধি গ্রহণ করা : রিয়েল এস্টেট সার্ভিস অতীতের তুলনায় এখন নিঃসন্দেহে অনেক উন্নত হয়েছে। নির্ভরযোগ্য রিয়েল এস্টেট এজেন্টের কাছে যাবার মাধ্যমে এত সব দুঃশ্চিন্তার অনেকখানিই লাঘব হতে পারে। আর বিশেষ করে ‘ওয়ান-স্টপ’ সার্ভিস বা এক প্রতিষ্ঠানে সকল প্রয়োজন মেটানোর সুবিধা যারা দিয়ে থাকে তাদের কাছে যাবার মাধ্যমে আপনার মানসিক এবং আর্থিক সাচ্ছ্যন্দই শুধু আসবে না, বিক্রি প্রকৃয়াও অনেক দ্রুত ও সহজে সম্পন্ন হয়ে যাবে। যেমন, ওয়ান স্টপ সার্ভিস হলে আপনাকে আলাদা করে আইনজীবীর কাছে ছুটতে হবে না।
উন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশে এখনো সেভাবে রিয়েল স্টেট সার্ভিস সহজলভ্য নয়। কিন্তু সম্প্রতি বড়ো মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানি bproperty.com এখানে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। বি-প্রপার্টি ইতিমধ্যে দেশের বৃহত্তম অনলাইন ডাটাবেস তৈরি করেছে, যেখানে কেনা-বেঁচা ও ভাড়া নেবার সকল তথ্য বিনামূল্যে দেখা যাবে। এছাড়াও বি-প্রপার্টি তাদের ক্লায়েন্টদের জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস দিয়ে থাকে, যেখানে ক্রেতা-বিক্রেতারা প্রতিষ্ঠিত ব্যারিস্টারদের কাছ থেকে আইনী সহযোগিতাসহ অন্যান্য সকল সহায়তা পাবেন।
সর্বোপরি রিয়েলটর নিয়োগের সুবিধা হচ্ছে তারা আপনাকে বাড়ি বা ফ্ল্যাটের মার্কেট অনুযায়ি সঠিক মূল্য নির্ধারণ থেকে শুরু করে অন্যান্য সব বিষয়ে সাহায্য করবে। মার্কেটের পরিস্থিত সম্বন্ধে তাদের যে জ্ঞান ও তথ্য থাকবে তা আপনার কাছে নেই। তবে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে কারো সাহায্য নেবার আগে ভালোভাবে খোঁজ খবর করা ভালো। আপনি কি ধরনের পাওয়ার অফ এ্যাটর্নিতে সাইন করছেন ইত্যাদি ব্যাপারেও সতর্ক থাকা উচিৎ।’
ইত্তেফাক/ইউবি